গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে বিএমডব্লিউ, লেক্সাস, রেঞ্জ রোভার ও টয়োটাসহ চারটি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ‘ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এসব গাড়ি আমদানি করেছে। তবে আমদানি নথিতে দেওয়া রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঠিকানায় গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
আমদানি নথিতে ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের ঠিকানা হিসেবে গেন্ডারিয়ার ৩/১ দীননাথ সেন রোড উল্লেখ করা হয়েছে। সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ওই স্থানে বর্তমানে একটি বহুতল আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।
২৬ কাঠা জমির ওপর ভবনটি নির্মাণ করছে ‘আল-আকসা বিল্ডার্স’। ভবনটির কয়েকটি ফ্ল্যাটে ইতোমধ্যে লোকজন বসবাসও শুরু করেছেন। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে আবাসন প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়।
আল-আকসা বিল্ডার্সের হিসাবরক্ষক আবদুল কাইয়ুম জানান, তারা ২০১৮ সাল থেকে সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ করছেন। সেখানে কোনো গাড়ির প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ছিল বলে তাঁর জানা নেই। তবে এর আগে ওই স্থানে ‘ক্রাউন’ নামে একটি বাতি তৈরির কারখানা ছিল বলে জানান তিনি।
ভবনটির পাশের দীর্ঘদিনের মুদিদোকান ‘সেলিম স্টোর’-এর মালিক মো. সেলিম মিয়াও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, সাতক্ষীরাভিত্তিক একটি ‘ক্রাউন’ কোম্পানি সেখানে বাল্ব তৈরি করত। প্রায় ১০ বছর আগে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে জমিটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়।
তবে ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের কোনো কার্যক্রম সেখানে না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির নামে এখনো ডাকযোগে চিঠি আসে বলে জানিয়েছেন আবদুল কাইয়ুম।
চার বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ
গত বৃহস্পতিবার কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অভিযানে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিটি গাড়ির মূল্য কোটি টাকার বেশি। মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়িগুলো দেশে আনা হয়েছিল।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও কুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়িগুলোর শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি শনাক্ত করা হয়।
২০১৫ সাল থেকেই যন্ত্রাংশ আমদানি
আমদানিকারকের ঘোষিত ঠিকানায় গাড়ির যন্ত্রাংশের কোনো ব্যবসার অস্তিত্ব না থাকলেও এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেস ২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে আসছে।
এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৭টি চালান আমদানি করেছে। এসব চালানের ঘোষিত আমদানিমূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার মার্কিন ডলার।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম চালান আসে। প্রায় দেড় হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ওই চালানে দুই টন গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
ওই বছর প্রতিষ্ঠানটি মোট চারটি চালান আমদানি করে। পরবর্তী বছরগুলোতে এক থেকে ছয়টি পর্যন্ত চালান আনা হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালে পাঁচটি এবং ২০২৫ সালে ছয়টি চালান আমদানি করা হয়।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, প্রতিটি চালানেই আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বেশি শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করেছে কাস্টমস। কোনো কোনো চালানে ঘোষিত মূল্য ও শুল্কায়নমূল্যের ব্যবধান ছিল প্রায় দেড় থেকে ছয় গুণ।
অর্থাৎ, আমদানিকারকের ঘোষিত মূল্য কম হওয়ায় তা গ্রহণ না করে বাস্তব বা নির্ধারিত মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন করেছে কাস্টমস।
এর আগে প্রতিষ্ঠানটির খালাস নেওয়া সব চালানই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে এসেছে। এর মধ্যে সাতটি চালান চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাস করা হয়। বাকি চালানগুলো চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়নের পর খালাস দেওয়া হয়।
এসব চালানের পণ্য ঘোষণায় গাড়ির যন্ত্রাংশ উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এবারই প্রথম মোংলা বন্দর দিয়ে আনা চালানটি খালাসের আগেই আটক করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের চালান খালাসের কাজে নিয়োজিত ছিল এম জেড ইন্টারন্যাশনাল। এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মাসুদুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
একাধিক চালানে একই রপ্তানিকারক
মোংলা বন্দর দিয়ে যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ি ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের কাছে রপ্তানি করেছে জাপানের আশিকাগা-শি শহরের ‘মাহি কার পোর্ট’।
এনবিআরের ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর ক্রাউন অটোমোবাইল সার্ভিসেসের একটি ছাড়া বাকি সব চালানের রপ্তানিকারক ছিল মাহি কার পোর্ট। ব্যতিক্রম একটি চালান পাঠিয়েছিল দুবাইভিত্তিক ‘মেগাসিটি জেনারেল ট্রেডিং’।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন গাড়ি ব্যবসায়ী জানান, জাপানে পুরোনো গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ রপ্তানির ব্যবসার সঙ্গে অনেক বাংলাদেশি যুক্ত রয়েছেন।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারেও গাড়ি জব্দ
মোংলা বন্দরে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দের পর চট্টগ্রামে একটি বিএমডব্লিউ এবং কক্সবাজারে আরও তিনটি গাড়ি জব্দ করেছেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের দাবি, এসব গাড়ির ব্যবহারকারীরা বৈধ আমদানিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখাতে পারেননি।
এ অবস্থায় একই আমদানিকারকের গত ১২ বছরে খালাস নেওয়া ২৭টি চালানে আসলে কী পণ্য দেশে এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন