নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের ঘোষণায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোয় সন্তুষ্ট তারা। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের কী হবে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বিভিন্ন পদের বেতনবৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে-স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান নতুন পে-স্কেলকে যৌক্তিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের সর্বশেষ পে-স্কেল হয়েছিল প্রায় ১১ বছর আগে। এ সময়ে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির তুলনায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার কম ছিল। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেল একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
তবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা প্রদান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহায়তা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর উদ্যোগও সমান্তরালভাবে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।
তবে আর্থিক প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একযোগে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না করে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এটি কার্যকর হবে।
স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আগে নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ভাতাগুলো ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি উঠেছে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পেলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বেসরকারি শ্রমিকরা পিছিয়ে পড়বেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন বলেন, নতুন পে-স্কেল ঘোষণাকে তারা স্বাগত জানান। তবে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে এলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের কথা। গার্মেন্টস খাতে সর্বশেষ মজুরি বৃদ্ধি কার্যকর হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। সে হিসাবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে মজুরি বৃদ্ধির কথা থাকলেও এখনো মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়নি।
কাজী রুহুল আমিন জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও জোটের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বেসরকারি শিল্প খাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কথা তুলে ধরে মজুরি না বাড়ানোর যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তারও সমালোচনা করেন তিনি। তার ভাষ্য, জ্বালানি সংকটের দায় শ্রমিকদের নয়। এ সংকটের সমাধান করতে হবে, তবে এর অজুহাতে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি বন্ধ রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি যেসব খাতে তিন বছরের বেশি সময় ধরে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি, সেসব খাতেও দ্রুত ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে নতুন পে-স্কেলের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও উদ্যোক্তা ফজলুল হক।
তিনি বলেন, নতুন পে-স্কেল অনুমোদন হলেও তা একযোগে কার্যকর হচ্ছে না। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণে এর সরাসরি প্রভাব বেসরকারি খাতে পড়ার সম্ভাবনা নেই।
ফজলুল হক আরও বলেন, বেসরকারি খাত বর্তমানে নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় কারখানা ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, রপ্তানি বাজারে সংকট রয়েছে এবং দেশে জ্বালানি সমস্যাও চলছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বেতন বাড়ানোর চেয়ে কারখানা চালু রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন বেতন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
ফজলুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তাদের দাবি যৌক্তিক ছিল। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ইতিবাচক।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে বাজারে হঠাৎ মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তিনি দেখছেন না। তার মতে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণে বাজারে একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগ কম।
তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল স্বস্তি আনলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি কীভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সরকারি বেতন কাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন