ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে একই দিনে তিন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে খুলনার এক সময়ের আলোচিত আন্ডারগ্রাউন্ড সর্বহারা নেতা শাহাদাত হোসেন লিটন ওরফে ‘খোঁড়া লিটন’ (৪৮) রয়েছেন। একই হাসপাতালে আবুল বাশার (২৮) ও আব্দুল কাইয়ুম (৬২) নামে আরও দুই বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ) এর সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ পৃথক সময়ে তিন বন্দির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
কারা সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি ছিলেন শাহাদাত হোসেন লিটন। তার গ্রামের বাড়ি খুলনার দৌলতপুর থানার পাবলা মধ্যপাড়ায়। তার বাবার নাম মৃত আব্দুল কাদের। তিনি ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন।
কারা হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, অসুস্থতার কারণে গত ২৮ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগার হয়ে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকাল পৌনে ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর প্রমাণপত্রে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হার্ট অ্যাটাক উল্লেখ করা হয়েছে।
অপর দুই বন্দি আবুল বাশার ও আব্দুল কাইয়ুম অসুস্থ হয়ে পড়লে কারারক্ষীরা তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সকালে পৃথক সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
কে এই ‘খোঁড়া লিটন’
শাহাদাত হোসেন লিটন ওরফে ‘খোঁড়া লিটন’ খুলনা অঞ্চলের এক সময়ের বহুল আলোচিত আন্ডারগ্রাউন্ড সর্বহারা সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-জনযুদ্ধ উপদলের আঞ্চলিক শীর্ষ নেতা হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে ২০০০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত খুলনার অপরাধজগতে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল বলে সে সময়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথি ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জানা যায়, ১৯৯৯ সালের দিকে লিটন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। ওই সময় ‘শিউলি’ নামে এক সহকর্মীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তারা দুজনই আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি ও চরমপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদালত থেকে চরমপন্থী নেতা ছিনতাই
২০০২ সালে খুলনা জজ কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে পুলিশের হেফাজতে থাকা ‘জনযুদ্ধ’ উপদলের প্রতিষ্ঠাতা চরমপন্থী নেতা দাদা তপনকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় লিটনের নাম আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় তার সহযোগী হিসেবে শিউলির নামও উঠে আসে।
সাংবাদিক মানিক সাহা ও হুমায়ুন কবির বালু হত্যা
খুলনার প্রখ্যাত সাংবাদিক মানিক সাহা ও সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন কবির বালু হত্যাকাণ্ডেও ‘খোঁড়া লিটনের’ নাম আলোচনায় আসে। ২০০৪ সালে সংঘটিত ওই দুই হত্যাকাণ্ডে বোমা হামলার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার কথা তদন্তে উঠে এসেছিল বলে জানা যায়।
এ ছাড়া খুলনার দৌলতপুরে প্রকাশ্য বোমা হামলায় বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান বাবলু হত্যার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।
আত্মগোপনে থেকে গ্রেপ্তার
২০০৪ সালের মাঝামাঝি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হলে লিটন খুলনা থেকে পালিয়ে যান। এরপর বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং পরে ঢাকার বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির বাসায় ছদ্মনামে আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা যায়।
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ২০০৬ সালের শেষ দিকে ঢাকা ও খুলনা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিশেষ অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হন।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তিনি ৩০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন