সংসদ অধিবেশনের শুরুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল—বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও কি জাতীয় পার্টির মতো ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’-এর ভূমিকায় যাচ্ছে? তবে সংসদের বাইরে দলটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সেই ধারণার বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে। রাজপথে সক্রিয় বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চাইছে জামায়াত।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চকে এরই একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন দলটির নেতারা। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিরোধী জোটের এমন বড় কর্মসূচি রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসনসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চের আয়োজন করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
জোটের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
লংমার্চের বিভিন্ন পথসভা ও জনসভায় জোটের নেতারা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে চাপ দেওয়ার কথা জানান। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচির ইঙ্গিতও দেন তারা।
‘সরকারকে সতর্ক করতে’ লংমার্চ
শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদীঘির সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, লংমার্চ জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলনের অংশ। সরকারকে সতর্ক করতেই এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শফিকুর রহমানের ভাষ্য, তারা চেয়েছিলেন সংসদের ভেতরেই বিষয়গুলোর সমাধান হোক। কিন্তু পরিস্থিতি তাদের রাজপথে আসতে বাধ্য করেছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চের আগে তারা তিন স্তরের কর্মসূচি পালন করেছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দলের এমন কর্মসূচি স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ দেওয়া হচ্ছে। সরকার দাবি না মানলে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হবে।
সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা
জামায়াত নেতাদের ভাষ্য, বিরোধী দল হিসেবে সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করা এবং সংসদের বাইরে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দিতেই বড় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
দলটির নেতারা মনে করছেন, লংমার্চের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কোনো ফল না এলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের অংশীজন এবং বিভিন্ন ছোট-বড় ইসলামী দলকে সঙ্গে নিয়ে সরকারবিরোধী অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে দলটি।
তাদের দাবি, সংসদের ভেতরে প্রতিবাদ ও ওয়াকআউটের পাশাপাশি রাজপথেও সক্রিয় থাকবে বিরোধী দল।
স্থানীয় নির্বাচনকে গুরুত্ব
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হিসেবে দেখছে জামায়াত। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, সরকার নির্বাচনে দলীয়করণ বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করতে পারে।
এ বিষয়ে সরকারকে আগেভাগে সতর্ক করার পাশাপাশি লংমার্চসহ ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূলে সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় দলটি। এর প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনেও পড়বে বলে মনে করছেন জামায়াত নেতারা।
কুমিল্লা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি মু. মাহবুবর রহমান বলেন, লংমার্চের মাধ্যমে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার তাদের দাবি মেনে নিলে সহযোগিতা করার কথাও জানান তিনি।
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে জামায়াত ও সমমনা দলগুলো।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে এই জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথও নিয়েছিলেন। তবে বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের বিধান না থাকায় বিএনপির সংসদ সদস্যরা ওই শপথ নেননি।
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দলের কাছে কমিটিতে সদস্য মনোনয়নের জন্য নাম চাওয়া হলেও জামায়াত তা দেয়নি। কমিটি গঠনের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
সামনে আরও কর্মসূচি
গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের অবস্থান কর্মসূচি থেকে আরও কয়েকটি লংমার্চ ও মহাসমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে লংমার্চ করার কথা রয়েছে। সিলেটের কর্মসূচি রেলপথে করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় জোটের মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সংসদের বাইরে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় ও দৃশ্যমান করতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন