কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহারে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভয়েস স্ক্যাম বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। প্রিয়জনের অবিকল কণ্ঠস্বর নকল করে বিপদে পড়ার গল্প শোনানো কিংবা মুক্তিপণ দাবি করে মুহূর্তেই অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পরিবারে একটি গোপন শব্দ বা ‘কোডওয়ার্ড’ নির্ধারণ করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ফোনের ওপাশে ছেলের কণ্ঠ, আসলে প্রতারণা
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বাসিন্দা এলিজাবেথ বেনজের অভিজ্ঞতা এ ধরনের প্রতারণার ভয়াবহতা তুলে ধরে। সম্প্রতি একটি ফোনকলে তিনি তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে জনের মতো একটি কণ্ঠ শুনতে পান। সেখানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানানো হয়, তার এক বন্ধু মারা গেছে।
এরপর ফোনের অপর প্রান্তে থাকা এক ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণ দাবি করেন এবং টাকা না দিলে ছেলেকে হত্যার হুমকি দেন। আতঙ্কিত হয়ে এলিজাবেথ টাকা দিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার জ্যেষ্ঠ সন্তানের মাধ্যমে জানতে পারেন, জন সম্পূর্ণ নিরাপদে ফুটবল মাঠে খেলছে।
পরে জানা যায়, ফোনকলটি ছিল এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি একটি ডিপফেক ভয়েস স্ক্যাম।
কোডওয়ার্ড হতে পারে নিরাপত্তার সহজ উপায়
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহার করে কণ্ঠস্বর নকল করা এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। এ ধরনের প্রতারণায় মানুষকে আবেগতাড়িত ও আতঙ্কিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ডিপফেক গবেষক হ্যানি ফারিদের মতে, গভীর রাতে হঠাৎ প্রিয়জন বিপদে পড়েছে—এমন খবর পেলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত হয়ে পড়ে। এ সময় সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আগে থেকেই একটি গোপন কোডওয়ার্ড ঠিক করে রাখা কার্যকর হতে পারে।
কোডওয়ার্ডটি এমন হওয়া উচিত, যা শুধু পরিবারের সদস্যরাই জানবেন। এটি কোনো বিশেষ শব্দ, পারিবারিক স্মৃতি বা এমন কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় হতে পারে, যা বাইরের কারও পক্ষে সহজে জানা সম্ভব নয়।
স্ক্যামের তিনটি লক্ষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রতারণায় সাধারণত কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়—
অতিরিক্ত জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করা: দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেওয়া হয়, যাতে যাচাই করার সুযোগ না থাকে।
অচিহ্নিত পদ্ধতিতে টাকা চাওয়া: বিটকয়েন, গিফট কার্ড বা নগদ অর্থের মতো পদ্ধতিতে টাকা দাবি করা হয়।
অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করতে বলা: ভুক্তভোগীকে পরিবার বা অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে একা করে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
তাই এ ধরনের ফোনকল এলে আতঙ্কিত হয়ে অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে প্রথমে পরিবারের নির্ধারিত কোডওয়ার্ড দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি ফোন কেটে পরিচিত নম্বরে সরাসরি ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনাটি যাচাই করা নিরাপদ।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
শুধু কোডওয়ার্ড নির্ধারণ করলেই হবে না, জরুরি পরিস্থিতিতে সেটি মনে রাখা ও ব্যবহার করার অভ্যাসও তৈরি করতে হবে। কয়েক মাস পরপর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোডওয়ার্ডটি মনে করিয়ে দেওয়া এবং সন্দেহজনক ফোনকলে অর্থ পাঠানোর আগে পরিস্থিতি যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
এআই প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বর নকল করা আরও সহজ হচ্ছে। ফলে প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর শুনলেই সেটিকে সত্য ধরে না নিয়ে পরিচয় যাচাই করা এবং হঠাৎ আসা আর্থিক দাবিতে সতর্ক থাকাই হতে পারে বড় ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচার কার্যকর উপায়।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন