বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধ থাকা মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেন পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য আন্তসরকার রেলওয়ে বৈঠকে (আইজিআরএম) আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী এ বৈঠক। দুই দেশ একমত হলে আগামী মাস থেকেই তিনটি আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানায়, বৈঠকে বন্ধ থাকা তিনটি ট্রেন চালুর পাশাপাশি রাজশাহী-কলকাতা রুটে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনার বিষয়টিও আলোচনায় তোলা হবে। বর্তমানে মৈত্রী এক্সপ্রেসের রুট যমুনা সেতু হয়ে।
ভিসা জটিলতায় এত দিন বন্ধ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেসের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইটেও বর্তমানে তিনটি আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনের যাত্রা ১৮ জুলাই ২০২৪ থেকে স্থগিত থাকার তথ্য দেওয়া রয়েছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, তৎকালীন সময়ে ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই ভিসা কার্যক্রমে কড়াকড়ি থাকায় ট্রেনগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ এগোয়নি। ভিসা স্বাভাবিক না হলে পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিষয়টি স্থগিত ছিল। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের ভিসা কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ায় আন্তদেশীয় ট্রেন চালুর বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।
২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকা-কলকাতা রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়। ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খুলনা-কলকাতা রুটে চালু হয় বন্ধন এক্সপ্রেস। আর ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটে মিতালী এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালের ১ জুন।
পদ্মা সেতু হয়ে মৈত্রী চালানোর প্রস্তাব
বন্ধ ট্রেনগুলো পুনরায় চালুর পাশাপাশি মৈত্রী এক্সপ্রেসের রুট পরিবর্তনের প্রস্তাবও দেবে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-কলকাতা রুটে ট্রেনটি পরিচালনার বিষয়টি বৈঠকের আলাদা এজেন্ডায় রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া রাতে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা, যাত্রীবাহী ট্রেনে পার্সেল পরিবহনের জন্য এক বা দুটি কোচ যুক্ত করা এবং আন্তদেশীয় রেল যোগাযোগের পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হবে।
রাজশাহী থেকে কলকাতার পথে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাবও দেবে বাংলাদেশ।
২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন চালানোর প্রস্তাব
যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি বৈঠকে গুরুত্ব পাবে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল। দর্শনা-গেদে, পেট্রাপোল-বেনাপোল ও রহনপুর-সিংহাবাদ রুটে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ।
বর্তমানে এসব রুটে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সীমিত সময়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে মনে করছে, সময়সীমা বাড়ানো গেলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
ভিসা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব
বৈঠকে রুটভিত্তিক ভিসা ব্যবস্থার পরিবর্তনের বিষয়টিও তুলবে বাংলাদেশ। বর্তমানে কেউ বিমানে ভারতে প্রবেশ করলে ট্রেন বা সড়কপথে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষ এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন চায়, যাতে যাত্রীরা প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন পরিবহনপথ ব্যবহার করতে পারেন।
এ ছাড়া ভারতীয় রেলের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া অর্থ এবং বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় রেলের যেসব ওয়াগনের নিয়মিত বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা পিরিয়ডিক ওভারহলিংয়ের প্রয়োজন হয়েছে, সেগুলো নিয়েও আলোচনা হবে।
রেল প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ
ভারতীয় ঋণে চলমান কয়েকটি রেল প্রকল্পের অগ্রগতিও বৈঠকের আলোচনায় থাকবে। এর মধ্যে ঢাকার কমলাপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত দুটি নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া ভারতীয় অর্থায়নের আরও কিছু প্রকল্প, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বাংলাদেশ রেলের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্রসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হবে। ফলে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস কবে থেকে আবার যাত্রী নিয়ে চলবে, তা নির্ভর করছে বৈঠক ও পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন