স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের জন্য প্রায় অভিন্ন নতুন আচরণবিধি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নতুন বিধিমালায় নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সীমিত পরিসরে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। মাইক ও ভ্রাম্যমাণ বাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের জন্য পৃথক আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ করা হয়।
দীর্ঘদিন দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হবে। ২০১৬ সালের আচরণবিধি বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের জন্য নতুন বিধিমালা জারি করল কমিশন।
প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ
নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হলেও প্রতিটির আকার ও ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট × ৪ ফুট।
লিফলেট ও হ্যান্ডবিল হবে এ-৪ আকারের।
ফেস্টুনের সর্বোচ্চ আকার ১৮ × ২৪ ইঞ্চি।
বিলবোর্ডের প্রচার অংশের সর্বোচ্চ আকার ১৬ × ৯ ফুট।
সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
প্রচারের সামগ্রী সাদা-কালো হতে হবে। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারসামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখ উল্লেখ করতে হবে।
প্রচারে ব্যবহৃত প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না। জীবন্ত প্রাণী ব্যবহার করেও প্রচার চালানো যাবে না।
মাইক ব্যবহারে সময়সীমা
নির্বাচনী প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এ সময় একটির বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
একই সময়সীমায় ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহন ব্যবহার করেও প্রচার চালানো যাবে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো যাবে। তবে এ বাবদ ব্যয় সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে দেখাতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
ভোটারের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধ
প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ভোটার কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না।
এ ছাড়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ ওঠার পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রচারে থাকবেন না গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এ তালিকায় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতা, সংসদ উপনেতা, সংসদ সদস্য এবং সিটি মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট পদমর্যাদার ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে।
প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক কিংবা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিও নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
আচরণবিধি ভাঙলে শাস্তি
নতুন আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান বহাল রয়েছে।
গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগও রয়েছে।
পাঁচ ধরনের নির্বাচনে যেসব বিধান
ইউনিয়ন পরিষদ: প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যয় নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে দেখাতে হবে। দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করা যাবে।
উপজেলা পরিষদ: প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড এবং পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনী ক্যাম্পের সংখ্যাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
পৌরসভা: প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক, ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনে প্রচার চালানো যাবে।
জেলা পরিষদ: প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। এ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
সিটি করপোরেশন: প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। পোস্টার নিষিদ্ধ থাকলেও নির্ধারিত আকারে ব্যানার, লিফলেট ও ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে।
মতামত নিয়ে চূড়ান্ত বিধিমালা
চলতি বছরের জুনে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধির খসড়া প্রকাশ করেছিল নির্বাচন কমিশন। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে খসড়া বিধিমালা নিয়ে মতামত নেওয়া হয়।
পরে পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে।
চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় কমিশন। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন