বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ২০১৫ সালে উপজেলা ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহত টিপু হাওলাদারের স্ত্রী সুমা আক্তার।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ তিনি জবানবন্দি দেন।
মামলার অপর আসামিরা হলেন—বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম, মো. জসিম উদ্দিন এবং তৎকালীন বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ। এদের মধ্যে মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন গ্রেপ্তার রয়েছেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, নিহত দুজনের একজন ছিলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং অপরজন একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
অভিযোগ অনুযায়ী, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ মহাসড়কের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের বড় ব্রিজের পশ্চিম পাশে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
‘স্বামী বলতেন, আমার কিছু হলে তোমাদের কী হবে’
জবানবন্দিতে সুমা আক্তার বলেন, তার স্বামী টিপু হাওলাদার তাকে জানিয়েছিলেন, এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ একটি সভায় তার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। বিষয়টি নিয়ে টিপু মানসিক চাপে ছিলেন।
সুমার ভাষ্য অনুযায়ী, এক রাতে টিপু তাকে বলেছিলেন, বরিশালে কয়েকটি ‘ক্রসফায়ার’ হয়েছে। তার কিছু হয়ে গেলে স্ত্রী ও সন্তানদের কী হবে—এ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
সুমা জানান, তার স্বামী মাস্টার্স পাস করেছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি টিপুকে সাময়িকভাবে ঢাকায় গিয়ে চাকরির চেষ্টা করতে বলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এলাকায় ফিরে আসার পরামর্শও দেন। এরপর ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি টিপু ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে তার মামার বাসায় ওঠেন।
‘ডিবি পুলিশ এসে টিপুকে তুলে নিয়ে গেছে’
জবানবন্দিতে সুমা আক্তার বলেন, ১৯ ফেব্রুয়ারি তার মামী ও আত্মীয় নাহার তাকে ফোন করে জানান, ডিবি পুলিশ এসে টিপু হাওলাদারকে তুলে নিয়ে গেছে। তখন তিনি গ্রামের বাড়িতে ছিলেন।
খবর পেয়ে শাশুড়ি ও ভাসুরসহ তিনি ভোরে আগৈলঝাড়া থানায় যান। সেখানে পুলিশ জানায়, টিপু হাওলাদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে তারা তখন পর্যন্ত কিছু জানে না।
এরপর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে স্বামীর খোঁজ নিতে যান সুমা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলা চেয়ারম্যান মর্তুজা খান, সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ লিটন ও সহ-সম্পাদক রইস সেরনিয়াবাতসহ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। তারা তাকে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
সুমা বলেন, পরামর্শ অনুযায়ী শাশুড়ি ও ভাসুরকে সঙ্গে নিয়ে বরিশালে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বাসায় যান। তবে বাসার দারোয়ান তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও দেখা করতে না পেরে তিনি ফিরে আসেন।
‘টিভিতে দেখলাম টিপু-কবির বন্দুকযুদ্ধে নিহত’
সুমা আক্তার জানান, ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে আগৈলঝাড়া ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও জাসাস নেতা কবির মোল্লা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন—এমন খবর দেখতে পান তারা।
এরপর আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে তিনি আগৈলঝাড়া থানায় যান। তার অভিযোগ, থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম ও এসআই নজরুল ইসলাম তার আত্মীয়স্বজনকে থানায় প্রবেশ করতে দেননি।
সুমার জবানবন্দি অনুযায়ী, পোস্টমর্টেম শেষে তার এক আত্মীয় ও মেঝ ভাসুরের কাছে টিপুর মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। দ্রুত দাফন সম্পন্ন করার জন্য তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, থানার লোকজন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন দ্রুত দাফন সম্পন্ন করার জন্য তাদের হুমকি দিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার এক ভাসুর ও ননদ তাদের ভাইয়ের মরদেহ দেখতেও পারেননি। ওই দিন সন্ধ্যায় টিপুর দাফন সম্পন্ন হয়।
‘হাসানাত ও এসপির নির্দেশে ঘটনা ঘটানো হয়েছে’
জবানবন্দিতে সুমা আক্তার বলেন, ঘটনার কয়েক দিন পর লোকমুখে তিনি জানতে পারেন, স্থানীয় এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশাল জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসানউল্লাহর নির্দেশে উজিরপুর থানার এসআই মাহাবুল ও এসআই জসিম এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।
তবে সাক্ষ্যে তিনি স্পষ্ট করেন, মাহাবুল ও জসিম নাম দুটি সঠিক হলেও তাদের তৎকালীন পদবি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলায় সুমা আক্তারের এই জবানবন্দি মামলার অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই করা হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন