অ্যাপলের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জন টার্নাসের সামনে আজ প্রথম বড় পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোয় বার্ষিক পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে নতুন আইফোনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের আলোচিত প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন উন্মোচন করতে পারে প্রযুক্তি জায়ান্টটি।
টার্নাসের নেতৃত্বে এটিই অ্যাপলের প্রথম বড় পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান। গত ১ সেপ্টেম্বর টিম কুকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সিইওর দায়িত্ব নেন তিনি। প্রায় ১৫ বছর অ্যাপলের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর কুক এখন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান।
৫১ বছর বয়সী টার্নাস ২০০১ সালে অ্যাপলের পণ্য নকশা দলে যোগ দেন। পরে হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাক, অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডসসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রকৌশল কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন।
অ্যাপলের ‘সারপ্রাইজ এন্ড সাইন’ অনুষ্ঠানটি ক্যালিফোর্নিয়া সময় বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় শুরু হবে। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা। অ্যাপলের ওয়েবসাইট, অ্যাপল টিভি ও ইউটিউব লাইভে সরাসরি দেখা যাবে আয়োজনটি।
সিইও হিসেবে কর্মীদের কাছে দেওয়া প্রথম বার্তায় টার্নাস আসন্ন আয়োজনকে ‘ফেনোমেনাল’ বা অসাধারণ হবে বলে প্রত্যাশা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সামনে বড় একটি পণ্য উন্মোচনের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মূল আকর্ষণ ফোল্ডেবল আইফোন
এবারের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সম্ভাব্যভাবে ডিভাইসটির নাম ‘আইফোন আলট্রা’ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফোনটির নাম, নকশা কিংবা দাম সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি অ্যাপল।
ধারণা করা হচ্ছে, ভাঁজ করা অবস্থায় ফোনটি অনেকটা পাসপোর্টের মতো হতে পারে। খুললে পাওয়া যেতে পারে বড় পর্দা। স্যামসাং, গুগল ও হুয়াওয়ে ২০১৯ সাল থেকে ফোল্ডেবল ফোন বাজারে আনলেও অ্যাপলের প্রবেশে এ বাজারের প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে।
দামও হতে পারে আলোচনার অন্যতম বিষয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, ফোনটির দাম ২ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি হতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, অ্যাপলের ফোল্ডেবল ফোনের গড় বিক্রয়মূল্য ২ হাজার ৫৫০ ডলারের বেশি হতে পারে।
আইডিসির হিসাবে, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের সরবরাহ ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ২৯ লাখ ইউনিটে পৌঁছাতে পারে। ২০২৭ সালের মধ্যে অ্যাপল ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি ফোল্ডেবল আইফোন সরবরাহ করে বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বদলাতে পারে আইফোন উন্মোচনের কৌশল
এবার অ্যাপলের প্রচলিত আইফোন উন্মোচন কৌশলেও পরিবর্তন আসতে পারে। অনুষ্ঠানে আইফোনের প্রো ও প্রো ম্যাক্স মডেলের নতুন সংস্করণ দেখানো হতে পারে। তবে তুলনামূলক কম দামের সাধারণ আইফোন এবং আইফোন এয়ারের হালনাগাদ সংস্করণ আগামী বসন্ত পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে।
এর ফলে নতুন ফোল্ডেবল আইফোনের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে অ্যাপল। কয়েক দশকের প্রচলিত স্মার্টফোন নকশা থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে নতুন ডিভাইসটি। তাই বিশ্লেষকদের কাছে এটিই এবারের আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ।
সংকটের মুখে স্মার্টফোন বাজার
অ্যাপলের নতুন পণ্যগুলো এমন সময়ে বাজারে আসছে, যখন মেমোরি চিপের সংকটে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর জন্য চিপের ব্যাপক চাহিদাও এ সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন সরবরাহ ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ১০০ কোটির কিছু বেশি হতে পারে। এটি স্মার্টফোন বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন হতে পারে। একই সময়ে স্মার্টফোনের গড় বিক্রয়মূল্য ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৫৮১ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তবে সংকুচিত বাজারে ব্যতিক্রম হতে পারে ফোল্ডেবল ফোন। আইডিসির মতে, চলতি বছর স্মার্টফোন বাজারের প্রায় সব অংশ সংকুচিত হলেও ফোল্ডেবল ফোনের সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে অ্যাপলের সম্ভাব্য প্রবেশ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সিরিও বড় পরীক্ষা
শুধু নতুন হার্ডওয়্যার নয়, নতুন সিইওর সামনে আরেকটি বড় পরীক্ষা হতে পারে অ্যাপলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘সিরি’। সিরিকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নেওয়ার ঘোষণা আগেই দিয়েছে অ্যাপল। এ ক্ষেত্রে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও আংশিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গুগলের জেমিনি ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে তাল মেলাতে নতুন সিরির সাফল্য অ্যাপলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। টার্নাসকে গ্রাহকদের বোঝাতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও অ্যাপলের ডিভাইসগুলো প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম।
এ ছাড়া নতুন অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডসও আজকের আয়োজনে দেখা যেতে পারে বলে বিভিন্ন প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অ্যাপল এখনো অনুষ্ঠানের পূর্ণ পণ্যতালিকা প্রকাশ করেনি।
সব মিলিয়ে আজকের আয়োজন শুধু নতুন আইফোন উন্মোচনের অনুষ্ঠান নয়; জন টার্নাসের নেতৃত্বে অ্যাপলের নতুন অধ্যায়ের প্রথম বড় পরীক্ষাও এটি। বহু প্রতীক্ষিত ফোল্ডেবল আইফোন সত্যিই সামনে আসে কি না এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় অ্যাপল কী বার্তা দেয়—নজর থাকবে সেদিকেই।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন