ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারলে আগামী বছর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনা কমানোর কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা নীরবে আলোচনা করছেন বলে ছয়টি সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কতটা রাখা হবে, তা নিয়ে একাধিক বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু সামরিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী ঘাঁটি ছাড়াই কিছু স্পর্শকাতর অভিযান পরিচালনার বিষয় রয়েছে।
এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এটি বড় ধরনের পরিবর্তন হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি দুটি বিমানবাহী রণতরি ও এক ডজনের বেশি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ বিপুল সামরিক সরঞ্জামও এই অঞ্চলে রয়েছে।
তবে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে এসব সামরিক স্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী বছর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েনের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য সামরিক বাহিনী কয়েকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলমান থাকায় বিমান হামলা পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো এখনই ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সিআইএও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
কিছু ঘাঁটি মাটির নিচে নেওয়ার চিন্তা
আলোচনার বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাত শেষ হওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা বাড়াতে কিছু সামরিক স্থাপনা মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার পর এ পরিকল্পনা গুরুত্ব পেয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এসব দুর্বলতার বিষয় আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু তা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট জরুরি পদক্ষেপ নেয়নি।
৯/১১-এর পর বেড়েছিল মার্কিন উপস্থিতি
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি ও গোয়েন্দা স্থাপনার বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে ওয়াশিংটন।
ইরাকে ২০০৩ সালের আগ্রাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যে আনুমানিক ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন সেনা ছিল। ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা কখনো এক লাখের নিচে নামেনি।
২০১১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফগানিস্তান থেকে সেনা কমানোর ঘোষণা দেন এবং ইরাক থেকেও যুদ্ধরত সেনা প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু পরে ইরাকে ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর উত্থানের পর আবারও মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়।
এরপর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনার সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। একই সময়ে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলাও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন
ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের মার্কিন স্থাপনাগুলোও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্থাপনা পুনর্নির্মাণ না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এর পেছনে সম্ভাব্য বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিও রয়েছে।
পেন্টাগনের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা তৃতীয় জুলস জে হার্স্ট এর আগে বলেছিলেন, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা মেরামতে কত খরচ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক অবস্থান কেমন হবে, তার ওপরও বিষয়টি নির্ভর করবে।
আলোচনার সঙ্গে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন সেনা কমাতে আগ্রহী। একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতিরক্ষার আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো পর্যালোচনা শুরু হয়নি। সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থান দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার চেষ্টা বারবার থেমেছে
নাইন-ইলেভেনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে সামরিক উপস্থিতি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কৌশলগত মনোযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ইসলামিক স্টেটের উত্থান, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার মধ্যপ্রাচ্যে সামরিকভাবে সক্রিয় করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে—এমন কোনো চুক্তির কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলা অব্যাহত রয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানোর সামরিক পদক্ষেপ তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে সম্ভবত সফল হবে না। ফলে ট্রাম্প অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে এবং কত সময় লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা ‘শিগগিরই’ ফিরছেন না বলে গত সপ্তাহে জানিয়েছেন মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন