চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মাত্র ৬ হাজার ৫০০ সদস্য। অর্থাৎ নগরের প্রায় ১ হাজার ২০০ নাগরিকের বিপরীতে রয়েছেন একজন পুলিশ সদস্য।
জনসংখ্যা ও অপরাধের পরিধি বাড়লেও সেই অনুপাতে পুলিশের জনবল না বাড়ায় মাঠপর্যায়ের সদস্যদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত দায়িত্ব ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপ। এতে নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও নিজেদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত থানার দায়িত্বের পাশাপাশি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, ভিআইপি প্রটোকল, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিভিন্ন জরুরি দায়িত্বও সীমিতসংখ্যক সদস্যকে সামলাতে হয়। জনবল সংকটের কারণে অনেক সদস্যকে একটানা দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
ঈদ, পূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবেও অনেক সদস্য নির্ধারিত ছুটি পান না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ছুটি না পাওয়ায় ক্লান্তি ও মানসিক চাপ বাড়ছে। এতে একদিকে পুলিশের কর্মক্ষমতা কমার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নিজেদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ছে।
৪৭ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ, পুলিশ বেড়েছে সামান্য
১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর ছয়টি থানা ও ৩ হাজার ৬২২ জন জনবল নিয়ে সিএমপির যাত্রা শুরু হয়। সে সময় চট্টগ্রাম নগরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ। ৪৭ বছর পর নগরের জনসংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও পুলিশের জনবল বেড়েছে তুলনামূলকভাবে সামান্য।
সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে প্রতি ২৭৬ নাগরিকের বিপরীতে একজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। ১৯৯০ সালে এ অনুপাত দাঁড়ায় ৪৬৫ জনে একজন এবং ২০১৭ সালে ৮৪৬ জনে একজন। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ নাগরিকের বিপরীতে রয়েছেন একজন পুলিশ সদস্য।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এ অনুপাত শুধু নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য নয়, দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি থানায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য না থাকলে একই সদস্যকে তদন্ত, টহল, আসামি গ্রেপ্তার, আদালতে হাজিরা, মামলা-সংক্রান্ত কাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে হয়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বদলি হলেও পূরণ হচ্ছে না শূন্যপদ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএমপির একটি থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা জানান, অনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও তাদের জায়গায় নতুন করে সদস্য পদায়ন করা হয়নি। ফলে বিদ্যমান জনবল দিয়েই অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলাতে হচ্ছে। এতে সদস্যদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
সিএমপির একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘থানায় জনবল সংকট রয়েছে। এ কারণে কাজের গতি কমে যায়। তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যাতে না হয়, সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ছুটি ছাড়া দায়িত্ব পালন করলে পুলিশ সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, সতর্কতা ও শারীরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্র বহন, অপরাধী গ্রেপ্তার, রাতের টহল ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ক্লান্তি তাদের নিজেদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নতুন জনবল নিয়োগে সীমাবদ্ধতা
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অর্থ ও প্রশাসন) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যখন-তখন নতুন করে জনবল নিয়োগ বা পদায়ন করতে পারি না। কতজন জনবল থাকতে পারবে, সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতা রয়েছে।’
তিনি বলেন, বর্তমানে সিএমপিতে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জনবল রয়েছে এবং থানাগুলোও জনবল সংকটের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত নতুন থানা ও পুলিশ লাইন স্থাপনের ক্ষেত্রেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন