দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন খাত বহুমুখী সংকটে রীতিমতো রক্তক্ষরণ করছে। তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা দিনে ২ থেকে ৩ ঘণ্টার বেশি চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই এবং বিদেশি ক্রেতাদের রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের পরিবর্তে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বাজারে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ রফতানি আদেশ বাতিলও করছেন। দ্রুত গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করা না গেলে সামনে শিল্প খাতে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দা, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, অভ্যন্তরীণ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং নীতিগত জটিলতা—সব মিলিয়ে শিল্প খাত একসঙ্গে একাধিক চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাবে উৎপাদন কমছে, বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এবং অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছেন।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটই বড় বাধা
উদ্যোক্তাদের মতে, শিল্প খাতের বর্তমান সংকটের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। শিল্পের জন্য অপরিহার্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুটোরই সরবরাহ এখন তীব্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। একই সঙ্গে দিনে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে গার্মেন্টস, সিরামিক, স্টিল, সিমেন্ট ও কাচ শিল্পের উৎপাদন ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কিছু পোশাক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখলেও এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় তিনগুণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
রফতানি আদেশ হারানোর আশঙ্কা
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়াও দেশের শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে। ইইউর বাজারে পোশাকের চাহিদা ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।
বাংলাদেশ সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা রফতানি আদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছেন। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
উচ্চ সুদে নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা
শিল্প খাতের আরেকটি বড় সমস্যা উচ্চ সুদ ও ব্যাংক ঋণের সংকট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নীতির কারণে বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, এত উচ্চ সুদে নতুন শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না কেউ। একই সঙ্গে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধেও অনেক প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিদ্যমান শিল্পগুলোও আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
দুই বছরে বন্ধ ৪৩৬ পোশাক কারখানা
রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৪৩৬টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।
তবে একই সময়ে নতুন ৩৩৬টি কারখানা উৎপাদনে আসায় প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, নতুন বিনিয়োগ এলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে সংকট তীব্র
দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
নরসিংদীতে ৩০০টির বেশি কারখানা বন্ধ রয়েছে। জেলাটিতে প্রায় ৩ হাজার টেক্সটাইল ও ডাইং মিল রয়েছে, যেগুলো দেশের স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে। গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় কিছু কারখানা বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করছে।
গাজীপুরে গ্যাসের চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। সেখানে দৈনিক ৫৯০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর ফলে ওই এলাকার ১৮ থেকে ২২ শতাংশ কারখানা বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ৮৫০টি কারখানার মধ্যে ৯০০টি বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪৯ শতাংশ কারখানা উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
ময়মনসিংহে ২৯৩টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৯৯টি গ্যাসনির্ভর। সেখানে গড়ে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। হবিগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় ১৭১টি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রামেও শিল্প সক্ষমতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। জাতীয় পর্যায়ে নিটওয়্যার ও ডাইং শিল্পের উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
ধুঁকছে অন্যান্য শিল্পও
শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ বিভিন্ন খাতেও সংকটের প্রভাব পড়েছে। দেশীয় বাজারে সিমেন্টের বিক্রি ১৮ শতাংশ, ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রি ২২ শতাংশ এবং স্টিলের বিক্রি ১৫ শতাংশ কমেছে।
গ্যাস সংকটের কারণে অনেক এলাকায় কারখানা সপ্তাহে তিন দিন পর্যন্ত চালানো হচ্ছে। ৩০টি সিরামিক কারখানার মধ্যে ১২টিতে উৎপাদন বন্ধের পথে। স্টিল মিলগুলোও প্রায় ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের কারখানাগুলোও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতা হারাচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানি ব্যাহত হওয়ায় এ খাতের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। উদ্যোক্তাদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ শতাংশ বন্ধ হওয়ার পথে। প্রায় ৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সংকটে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি
উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, হবিগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন ঝুলে রয়েছে। এতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ আটকে আছে।
উদ্যোক্তারা আরও জানিয়েছেন, গত চার বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে।
উদ্যোক্তাদের দাবি
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্প খাতের সংকট থেকে এখনো বের হওয়া সম্ভব হয়নি। করোনা মহামারি থেকে শুরু করে একের পর এক সংকট শিল্প উদ্যোক্তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
তিনি জানান, গত দুই বছরে নিট খাতের ১৭৬টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং ৭৮ হাজার ৯৮৩ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। একই সময়ে নতুন ১৬০টি কারখানা যুক্ত হয়ে প্রায় ১ লাখ ৮৯০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগের অনেক কারখানাও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাচ্ছে না।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্প খাতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। বর্তমানে কারখানাগুলো তাদের সক্ষমতার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। এটি ৮০ শতাংশে নেওয়া সম্ভব হলে উৎপাদন স্বাভাবিক হবে, ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধের পথও সহজ হবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জ্বালানি সংগ্রহের দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে বর্তমান সংকট দেখা দিয়েছে। অনির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি রফতানিমুখী শিল্প ও বড় শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব চলছে। শিল্প উৎপাদন ও রফতানি বাণিজ্যও সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। একমাত্র রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য সূচকও চাপের মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। ধারাবাহিকভাবে শিল্প উৎপাদন কমতে থাকলে শিল্প মালিকদের টিকে থাকা কঠিন হবে। ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে, আরও অনেক কারখানা বন্ধের পথে।
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, কারখানা বন্ধ হওয়ার অর্থ কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বাড়া। বেকারত্ব বাড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজেও পড়তে পারে। তাই শিল্প খাতের সংকট কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন