‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’—এই গান কণ্ঠে তুলে একদিন কুষ্টিয়ার দোলপূর্ণিমার আসরে দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণী। তখনও তিনি জানতেন না, সেই একটি গানই বদলে দেবে তার পুরো জীবন। লালন ফকিরের গানের সঙ্গে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আর থামেনি। ধীরে ধীরে লালনের বাণী, দর্শন ও সুরের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে মিশিয়ে নিয়েছিলেন তিনি, হয়ে উঠেছিলেন ‘লালনকন্যা’, ‘লালন সম্রাজ্ঞী’।
তিনি প্রয়াত শিল্পী ফরিদা পারভীন।
‘এই পদ্মা, এই মেঘনা’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’, ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়’—বাংলার মানুষের স্মৃতিতে মিশে থাকা অসংখ্য গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার কণ্ঠ। লালনের গানকে তিনি শুধু গেয়ে যাননি, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন।
আজ ১৩ সেপ্টেম্বর তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর আগে এই দিনে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেমে যায় তার কণ্ঠ। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ১৫ মিনিটে মারা যান ফরিদা পারভীন। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
যে গান বদলে দিয়েছিল জীবন
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া উপজেলার শাঔঁল গ্রামে জন্ম ফরিদা পারভীনের। বাবা দেলোয়ার হোসেন ছিলেন চিকিৎসক, মা রৌফা বেগম। বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন শহরে কেটেছে তার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় একটি সময়।
মাগুরায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতে হাতেখড়ি। পরে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন গুণী শিল্পীর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন। পাশাপাশি নজরুলসংগীতেও প্রশিক্ষণ নেন তিনি।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী হন ফরিদা পারভীন। তখন তার পরিচয় ছিল নজরুল ও আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকার সময় তার জীবনে আসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
পারিবারিক বন্ধু ও লালনসংগীতের সাধক মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনের গান শেখার সুযোগ পান তিনি। শুরুতে অবশ্য লালনের গান শেখার বিষয়ে তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। বাবার অনুরোধে একটি শর্তে রাজি হন—গান ভালো না লাগলে তিনি তা গাইবেন না।
১৯৭৩ সালে দোলপূর্ণিমার এক অনুষ্ঠানে তিনি গাইলেন লালনের গান—‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’। গান শেষ হওয়ার পর শ্রোতারা আরও একটি গান শোনার অনুরোধ করেন। ফরিদা পারভীন তখন জানান, তিনি মাত্র একটি গানই শিখেছেন এবং সেটিই গেয়েছেন।
সেই একটি গানই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তার নতুন জীবনের শুরু।
পরবর্তী সময়ে তিনি উপলব্ধি করেন, লালনের গানের মধ্যে শুধু সুর নেই; রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবোধ ও জীবনদর্শন। লালনের গান তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করেছিল যে, একসময় অন্য কিছু ভাবতেই পারতেন না।
মোকছেদ আলী সাঁইয়ের পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছ থেকেও তালিম নেন তিনি। গুরুপরম্পরার সেই সাধনাই তাকে গড়ে তোলে অনন্য এক লালনশিল্পী হিসেবে।
‘মুখ থেকে নয়, ভেতর থেকে গাইতেন’
অগ্রজ সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান একবার ফরিদা পারভীনকে স্মরণ করে বলেছিলেন, অন্যরা গান গাইলে অনেক সময় মনে হয় গানটি মুখ থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু ফরিদার লালনের গান শুনলে মনে হতো, তিনি একেবারে ভেতর থেকে গাইছেন।
প্রতিটি লাইনের অর্থ উপলব্ধি করে, হৃদয় দিয়ে গান গাইতেন ফরিদা। তার গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই গভীর উপলব্ধি।
তিনি লালনের গানকে কখনো শুধুই পরিবেশনার বিষয় হিসেবে দেখেননি। তার কাছে এটি ছিল সাধনা। তাই লালনের গান পরিবেশনে অযথা চাকচিক্য কিংবা বাহুল্য পছন্দ করতেন না। তার বিশ্বাস ছিল, লালনের বাণী শালীনতা, নিষ্ঠা ও যথাযথ উপলব্ধির সঙ্গে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
প্রায় ছয় দশক ধরে লালনের গান চর্চা করেছেন তিনি। শুধু সিডি কিংবা ইউটিউব দেখে গান শেখাকে তিনি যথেষ্ট মনে করতেন না। গুরু ধরে দীর্ঘদিন সাধনা ও আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে লালনের গানকে ধারণ করাই ছিল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
লালনকে নিয়ে গেছেন বিশ্বমঞ্চে
ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনের গান শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় হয়নি। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার কণ্ঠে বেজেছে লালনের দর্শন।
২০০১ সালে জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লালনের গান পরিবেশন করে সেখানকার শ্রোতাদের কাছে এই সংগীত ও দর্শনকে পরিচিত করে তোলেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাকে সুফি শিল্পী হিসেবেও পরিচিত করা হয়।
লালনের গানকে নির্দিষ্ট অঞ্চল বা গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিক সমাজ, উচ্চবিত্তের বসার ঘর এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তার জীবনসঙ্গী ও প্রখ্যাত বাঁশিশিল্পী গাজী আবদুল হাকিমও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ফরিদার ত্যাগ ও সাধনার কারণেই লালনের গান বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে নতুনভাবে পৌঁছেছে।
পুরস্কার এসেছে, বদলায়নি জীবন
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি পান।
২০০৮ সালে লাভ করেন জাপানের ফুকুওয়াকা এশীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কার। এছাড়া দেশ-বিদেশে পেয়েছেন আরও বহু সম্মাননা।
তবে পুরস্কার কিংবা খ্যাতি তার জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
সহজ-সরল জীবন, মানুষের জন্য নিবেদন
ফেরদৌসী রহমানের ভাষায়, ফরিদার গান যেমন সহজ, সরল ও মিষ্টি ছিল, তার জীবনও ছিল তেমনই। গান ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না তার।
এই সরলতার সঙ্গে যুক্ত ছিল গভীর মানবিকতা। করোনার কঠিন সময়েও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতেন। এতিমখানার শিশুদের দেখাশোনা করতেন। লালনের আখড়া থেকে কেউ তার কাছে এলে খালি হাতে ফিরতেন না।
স্বামী গাজী আবদুল হাকিমের স্মৃতিতে, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও উদারতার জায়গাতেও ফরিদা ছিলেন ‘সম্রাজ্ঞীর মতো’।
রেখে গেছেন ‘অচিন পাখি’
নতুন প্রজন্মকে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করাও ছিল ফরিদা পারভীনের বড় স্বপ্ন। প্রায় ১৭ বছর আগে স্বামী গাজী আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’।
সেখানে লোকগান, লালনসংগীত, নজরুলসংগীত, আধুনিক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি শেখানো হয় গিটার, তবলা ও ছবি আঁকা। তিন বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা—বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থী এখানে তালিম নেন।
তার দেখানো পথে বর্তমানে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী সংগীতচর্চা করছেন। ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন গাজী আবদুল হাকিম। তিনি জানেন, ফরিদার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তবু তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাওয়াকেই নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন।
‘সত্য বল সুপথে চল’
জীবনের শেষ দিকেও আত্মশুদ্ধির কথা বারবার বলতেন ফরিদা পারভীন। তার কাছে লালনের গান ছিল মানুষ হওয়ার শিক্ষা।
দেশে অস্থিরতা, বিভাজন কিংবা সংস্কৃতির ওপর আঘাতের প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, পরিবর্তনের শুরুটা করতে হবে নিজেকে দিয়ে। মানুষ নিজেকে শুদ্ধ করতে না পারলে সমাজের বিশৃঙ্খলাও থামবে না।
লালনের ‘সত্য বল সুপথে চল’ তাই তার কাছে কেবল একটি গান ছিল না; সেটিই যেন হয়ে উঠেছিল তার জীবনদর্শন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে নিয়মিত ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। একপর্যায়ে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং পরে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে চলে যান তিনি।
কুষ্টিয়ার পৌর কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। যে কুষ্টিয়া তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী, যে শহর তাকে লালনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, শেষ ঠিকানাও হলো সেই শহর।
গানেই বেঁচে থাকবেন ফরিদা
এক বছর হয়ে গেল ফরিদা পারভীন নেই। কিন্তু তাকে হারানোর অর্থ তার গানকে হারানো নয়।
রেডিওতে বাজলে ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম’, কোনো ভোরে ভেসে এলে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, কিংবা কোনো আসরে ‘সত্য বল সুপথে চল’ শুরু হলে মনে হয়—ফরিদা পারভীন বুঝি এখনো গাইছেন।
হয়তো এটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় বেঁচে থাকা।
মানুষ চলে যায়, কণ্ঠ থেমে যায়। কিন্তু কিছু গান মানুষের ভেতরে থেকে যায়। কিছু সুর প্রজন্ম পেরিয়ে নতুন কণ্ঠে জন্ম নেয়। আর কিছু শিল্পী তাদের গানের চেয়েও বড় হয়ে ওঠেন—একটি দর্শন, একটি সাধনা ও একটি সময়ের প্রতিনিধি হয়ে।
আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই বলা যায়, ফরিদা পারভীন তার গানের মধ্যেই বেঁচে আছেন। অচিন পাখি হয়ে তিনি উড়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন এমন কিছু সুর, যা বাংলার মানুষের হৃদয়ে আরও বহুদিন ডানা মেলবে।
আর যখনই কেউ গেয়ে উঠবে—‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’, তখনই হয়তো ফিরে আসবেন সেই লালনকন্যা—ফরিদা পারভীন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন