কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় শুরুতে পুলিশের ধারণা ছিল, তার কাছে থাকা দামি আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে তদন্ত এগোতে গিয়ে আইফোনের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় সামনে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধ, বয়সে বড়দের সঙ্গে অপ্রতিমের ঘনিষ্ঠতা এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের বিষয়ও তদন্তে উঠে এসেছে।
জেলা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের আইফোন নিয়ে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ফোন নিতে বাধা দিলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়।
এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন কিশোর। এ ছাড়া সিয়াম নামের আরও এক তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করছে পুলিশ।
টিকটক ভিডিওর কথা বলে বাসা থেকে ডাকা
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঘটনার দিন শুক্রবার অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করে আনতে মুঠোফোনের খুদে বার্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তুহিন একাধিকবার অপ্রতিমকে বার্তা পাঠিয়ে বাইরে আসতে বলেন।
একপর্যায়ে অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোন দিয়ে টিকটক ভিডিও তৈরি ও ছবি তোলার কথা বলা হয়। এতে রাজি হয়ে শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। পরিবারের সদস্যদেরও সে জানিয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে যাবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের একসঙ্গে চলাফেরার দৃশ্য পাওয়া যায়। ফুটেজে তাদের স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেখা যায়। পরে আরও দুজন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার পর হামলা
অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাস্থলটি মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে বলে জানা গেছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে সে বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে অন্যরাও তাকে আঘাত করে।
অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তারা—তদন্তে এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অপ্রতিমের মরদেহে মাথায় গুরুতর আঘাতসহ একাধিক ক্ষত পাওয়া যায়। তবে এসব ক্ষতের সবগুলো কীভাবে হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করছে তদন্তকারীরা।
পাঁচ হাজার টাকা নিয়েও বিরোধ
আইফোনের পাশাপাশি অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরের পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোর। ওই কিশোরকে অপ্রতিম পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল বলে তদন্তে জানা গেছে। সম্প্রতি অপ্রতিম সেই টাকা ফেরত চাইছিল।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টাকা ফেরত চাওয়ায় ওই কিশোর অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল। এমনকি অপ্রতিম মারা গেলে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন হবে না—এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাইসহ হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণের কাজ চলছে।
‘অসম বন্ধুত্ব’ নিয়ে তদন্ত
তদন্তে অপ্রতিমের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সম্পর্ককেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা এটিকে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিমের সঙ্গে যাদের নিয়মিত ওঠাবসা ছিল, তারা তার সমবয়সী সহপাঠী নয়; বয়সে বড়। তদন্তে তাদের সঙ্গে অপ্রতিমের একসঙ্গে তোলা ছবি ও ভিডিও এবং টিকটকের জন্য তৈরি বিভিন্ন ভিডিওর তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে অন্যদের তথ্য
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পাওয়া যায় তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়। পুলিশ জানায়, শনিবার সকালে তাকে হেফাজতে নেওয়া হলেও তখনো অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর তদন্তকারীদের কাছে পৌঁছেনি।
পুলিশের ভাষ্য, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। পরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শনিবার রাতে তিনি ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা জানান। তবে প্রথমদিকে অন্যদের নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তুহিনের মুঠোফোনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ওই কিশোরের একাধিক ফোনকল আসে। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এলে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও এক কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল এবং হত্যার পেছনে আইফোন, টাকা নিয়ে বিরোধ নাকি অন্য কোনো কারণ কাজ করেছে—এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের তথ্য, জিজ্ঞাসাবাদ ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন