যুক্তরাষ্ট্রে চার দিনের সরকারি সফরের প্রথম দিনেই ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলা কর্মসূচিতে পূর্বনির্ধারিত ১২টির মধ্যে ১০টিতে সরাসরি অংশ নেন তিনি। সময় স্বল্পতার কারণে দুটি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত হতে পারেননি বলে জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের ডিপ্লোম্যাট সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান মাহদী আমিন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণসহ সফরের প্রথম দিনের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরতে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, প্রথম দিনের কর্মসূচিগুলোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সফরের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে আয়োজিত বিশেষ প্রাতরাশে অংশ নেন। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীরা উপস্থিত ছিলেন। দিনের শেষভাগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আয়োজিত নৈশভোজেও সস্ত্রীক অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী প্লেনারি অধিবেশনে অংশ নেন তারেক রহমান। এ সময় তার সঙ্গে ডা. জুবাইদা রহমান এবং বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল।
মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণকে তারা একটি বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন। একই পরিবারের তিন সদস্যের এভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনাকে তিনি বিরল বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
সফরের প্রথম দিনেই আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহামেদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বাড়ানো এবং পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। বৈঠকে এরদোয়ান তাকে নির্বাচনে বিজয় এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে তাকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। মাহদী আমিন জানান, হাইতির সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও প্রথম দিনেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একটি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে এবং অন্যটি জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতের সঙ্গে। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
মাহদী আমিন জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে পরদিন একটি আন্তর্জাতিক সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও জানান তিনি।
এদিকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ, অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বাজেট সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা আরও বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে যৌথ অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে।
তবে পূর্বনির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে সময় স্বল্পতার কারণে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে দুটি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি অংশ নিতে পারেননি। মেটার প্রতিনিধিদের সঙ্গে অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধি দল বৈঠক করে। সেখানে বাংলাদেশে মেটার বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীকে বিবেচনায় নিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতিসংঘ মিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন