ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেপ্তার ও তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে এসআইআরের আগে ব্যবহৃত ভোটার তালিকা ফিরিয়ে এনে পশ্চিমবঙ্গসহ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোতে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তিনি। বুধবার ফেসবুক লাইভে এসে এসব দাবি করেন মমতা।
মমতার অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এসআইআর কার্যক্রম শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ৯২ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্রে কারচুপি, ভোটের আগে দলীয় বুথ এজেন্টদের গ্রেপ্তার এবং ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগও তোলেন তিনি। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তৃণমূল নেত্রী।
মমতার বক্তব্যের পেছনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত ১০ মাসে ভোটার নিবন্ধন, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, ভোটার তথ্যভাণ্ডার ব্যবস্থাপনা এবং এসআইআর-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে কিছু আপত্তিতে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তকে অনুমোদনহীন বা বেআইনি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও ভোটার অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশন, বিজেপি ও আরএসএসের সমালোচনা করেছেন। তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ভিন্ন।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসআইআরসহ গত এক বছরে নেওয়া সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিন কমিশনারের সম্মতিতেই হয়েছে। দুই কমিশনারের উত্থাপিত আপত্তি, পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শকে কমিশনের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যায়, এসআইআরের মাধ্যমে প্রায় ২৭.১৬ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ২২ লাখের বেশি ভোটার পুনরায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন। কমিশনের দাবি, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত ও একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ও ছিল।
মমতা অবশ্য নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তিনি এসআইআরের মাধ্যমে বাদ দেওয়া ভোটারদের পুরোনো তালিকায় ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যে এসআইআরকে কেন্দ্র করে নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেসব রাজ্যে পুরোনো ভোটার তালিকা ব্যবহার করে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। এ দাবির পাশাপাশি জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেপ্তার ও ফৌজদারি তদন্তের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বিজেপি বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিরোধীরা নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করছে। ফলে এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি কমিশনের সিদ্ধান্ত, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বাদ পড়া ভোটারদের আপিল প্রক্রিয়াও এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন