লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার তিন মাস পার হতে চললেও এখনো হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে প্রধান অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার গণপিটুনিতে নিহত হওয়ায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তার পরিচয় নিয়েও অসঙ্গতি পাওয়ায় তদন্ত আরও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বর্ণালংকার লুট, অর্থ লেনদেন, পূর্ববিরোধ কিংবা অভিযুক্তের মাদকাসক্তির মতো কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত এসবের কোনো একটিকে হত্যার নিশ্চিত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পুলিশের ধারণা, ঘটনার আগে নিহতদের সঙ্গে অন্তর মজুমদারের পরিচয় ছিল। তিনি আগে ওই ভবনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন এবং পরে ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা হিসেবে এলাকায় চলাফেরা করতেন। হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়। ফলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সরাসরি কোনো তথ্য পাওয়ার সুযোগ হয়নি।
তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেওয়া তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করছেন। হত্যার সময় বাসার ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল, হামলার মূল লক্ষ্য কে ছিলেন, আগে কোনো বিরোধ বা বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল কি না এবং পূর্বপরিচয় থাকা সত্ত্বেও কেন এমন হামলা চালানো হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তারা।
নিহত পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের সন্দেহ, তার মায়ের কাছে থাকা স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে। তবে তদন্তে বাসা থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা পাওয়া যাওয়ায় শুধু লুটপাটকে হত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে দেখার বিষয়ে পুলিশের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের একটি অংশের মধ্যে পূর্বের কোনো ঘটনার জেরে প্রতিশোধের ধারণাও রয়েছে। তবে এটিও এখনো তদন্তে প্রমাণিত কোনো তথ্য নয়। একইভাবে হত্যাকাণ্ডে অন্তর মজুমদার একাই জড়িত ছিলেন, নাকি তার সঙ্গে অন্য কেউ ছিল—সেটিও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে তদন্ত করা হয়। সিআইডিও ছায়া তদন্তে যুক্ত হয়েছিল। তবে বর্তমানে মূল তদন্ত রায়পুর থানা পুলিশই পরিচালনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনার পর থেকেই রায়পুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক রয়েছে। তিন মাস পেরিয়ে গেলেও হত্যার প্রকৃত কারণ প্রকাশ না পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা চলছে।
গত ২৫ জুন রায়পুর পৌরসভার দেনায়েতপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় মা ও তিন মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম এবং তার তিন মেয়ে সাইমা আক্তার, নাফিসা আক্তার ইকরা ও ফাতেমা আক্তার সিপা। প্রাথমিক ঘটনায় এক মেয়ে গুরুতর আহত হলেও পরে তারও মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর মজুমদারকে স্থানীয়রা আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হয়েছে এবং পৃথকভাবে গণপিটুনিতে অন্তরের মৃত্যুর ঘটনাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তদন্ত শেষ হওয়ার পরই তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন