প্রায় এক দশক ধরে চীনের লাইভস্ট্রিম বাণিজ্যের অন্যতম পরিচিত মুখ লি জিয়াকি। ‘লিপস্টিক কিং’ নামে পরিচিত এই তারকা বিক্রেতার অনুসারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। তার লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের প্রসাধনী পণ্য বিক্রি হয়েছে। তবে ভোক্তা ব্যয়ের ধীরগতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে চীনের লাইভস্ট্রিম বাণিজ্য।
২০১৬ সালে লাইভস্ট্রিমিং শুরু করা লি জিয়াকি মনে করেন, চার-পাঁচ বছর আগের মতো এই খাতের প্রবৃদ্ধি আর বিস্ফোরক নাও হতে পারে। তবে তার মতে, লাইভস্ট্রিম বাণিজ্য এখন একটি ‘স্থিতিশীল ও স্বাস্থ্যকর পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে।
চীনে ভোক্তা ব্যয়ের দুর্বলতার মধ্যেই এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের আগস্টে দেশটির খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে খুচরা বিক্রির মোট প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ।
এরপরও চীনের মানুষের কেনাকাটার ধরন বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে লাইভস্ট্রিম বাণিজ্য। ২০২৫ সালে দেশটির অনলাইন খুচরা বিক্রির ৩৬ শতাংশের বেশি এসেছে এই মাধ্যম থেকে। ২০২১ সালে এই হার ছিল ১৮ শতাংশেরও কম।
ডিজিটাল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চোজানের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাশলি দুদারেনক বলেন, লাইভস্ট্রিম বাণিজ্য এখনো বাড়ছে, তবে আগের তুলনায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোক্তাদের কাছ থেকে অর্থ ব্যয় করাতে ব্যবসাগুলোকে আরও বেশি প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, অথচ ভোক্তাদের বাজেটও সংকুচিত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে লাইভস্ট্রিম বাণিজ্যে দ্রুত প্রবেশ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন এমন ডিজিটাল উপস্থাপক ব্যবহার করছে, যারা দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে লাইভে থাকতে পারে। এতে মানব উপস্থাপকের তুলনায় পরিচালন ব্যয়ও অনেক কমছে।
চীনের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান জেডি ডটকম ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যবসায়ীদের জন্য বিনা মূল্যে এআই উপস্থাপক সেবা চালু করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পরবর্তী তিন মাসে এ প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এআই উপস্থাপক ব্যবহারের মাধ্যমে লাইভস্ট্রিম পরিচালনার খরচ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
লি জিয়াকির মতে, এআই ইতোমধ্যেই লাইভস্ট্রিম বাণিজ্যকে পরিবর্তন করছে। তার প্রতিষ্ঠানও কীভাবে এই প্রযুক্তিকে নিজেদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে।
তবে এআই মানব উপস্থাপকদের পুরোপুরি সরিয়ে দেবে বলে মনে করেন না তিনি। লি জিয়াকির ভাষায়, এআই অনেকটা ‘গতকালের আমি’, আর একজন মানব উপস্থাপক প্রতিদিন নতুন ধারণা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারেন।
তার মতে, মানব উপস্থাপকদের বিকল্প হিসেবে না দেখে এআইকে দক্ষতা বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একজন উপস্থাপক রাতে বিশ্রামে থাকলেও তার এআই সংস্করণ দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে।
ক্রেতাদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও এআইয়ের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন লি জিয়াকি। তার মতে, মানুষ যেমন চিন্তা করে, এআইও তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত দেয়। তবে এআইয়ের চিন্তার ভিত্তি মূলত অতীতের মানুষের তৈরি তথ্য ও চিন্তাভাবনা। তাই তার কাছে এআই ও মানব উপস্থাপক পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
লাইভস্ট্রিমিং এজেন্সি রোমোমোর ২৩ বছর বয়সী উপস্থাপক লু লিনও মনে করেন, ক্রেতার আস্থা অর্জন এবং সূক্ষ্ম বিচারবোধ তৈরির ক্ষেত্রে ডিজিটাল উপস্থাপক এখনো মানুষের সমকক্ষ নয়।
তিনি বলেন, কোনো ক্রেতা নিজের উচ্চতা ও ওজন জানালে এআই হয়তো নির্দিষ্ট পোশাকের মাপ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু একজন মানব উপস্থাপক ক্রেতার প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বুঝে আরও বিস্তারিতভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারেন। কারণ লাইভ বাণিজ্যে শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়, ক্রেতার সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এআই-নির্ভর বাণিজ্য নিয়ে চীন সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তাদের মধ্যেও আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার নিয়ম কার্যকর হয়েছে।
চীনের টিকটক হিসেবে পরিচিত বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন দৌইন সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর লাইভস্ট্রিম নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল উপস্থাপক ব্যবহারের বিষয়টি দর্শকদের জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কয়েকজন প্রভাবশালী অনলাইন বিক্রেতা নিজেদের পরিবর্তে এআই অবতার ব্যবহারের কথা প্রকাশ করার পর দর্শকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ারও মুখোমুখি হয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি মানবিক উপস্থিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতাও এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
চোজানের প্রতিষ্ঠাতা দুদারেনকের মতে, মানব লাইভস্ট্রিম উপস্থাপকের সংখ্যা ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে, তবে তারা পুরোপুরি হারিয়ে যাবেন না। বরং এআই-নির্ভর কনটেন্ট যত বাড়বে, ভোক্তাদের একাংশ মানব উপস্থাপকদের স্বাভাবিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার দিকে আবারও ঝুঁকতে পারেন।
অন্যদিকে লাইভস্ট্রিম বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুধু বিক্রির পরিমাণ নয়, লাভজনকতাও এখন ব্যবসাগুলোর বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। রোমোমোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ঝাং জুনলিং বলেন, শুরুতে বড় ছাড়ের ওপর নির্ভর করে যে ব্যবসায়িক মডেল এই খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছিল, সেই পর্যায় এখন অনেকটাই পেরিয়ে গেছে।
তার মতে, মুনাফার হার কমে আসায় ব্যবসাগুলো তারকা উপস্থাপকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাচ্ছে। তীব্র প্রতিযোগিতার এই সময়ে বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে চীনের লাইভস্ট্রিম বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার চেহারাও বদলাচ্ছে। এটি এখন শুধু কে বেশি দর্শক টানতে পারে বা কোন উপস্থাপক বেশি পণ্য বিক্রি করতে পারেন—সেই প্রতিযোগিতা নয়; বরং প্রযুক্তি, খরচ, আস্থা, পরিচালন দক্ষতা এবং লাভজনকতার সমন্বিত প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন