গাজায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামী ২৭ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে ইসরায়েল। নতুন সরকার গাজার বিষয়ে কী নীতি গ্রহণ করবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন গাজার বাসিন্দারা। গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা এই নির্বাচনে সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ না পেলেও নির্বাচনী প্রচারণা ও সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখছেন।
গাজায় দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে বসবাস করছেন লাখো মানুষ। ৩০ বছর বয়সী মরিয়ম আল-দাবালা যুদ্ধের সময় প্রায় ১৪ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তার প্রধান উদ্বেগ, নতুন ইসরায়েলি সরকারও বর্তমান সরকারের মতো গাজা নিয়ে একই ধরনের নীতি অনুসরণ করবে কি না।
মরিয়মের আশঙ্কা, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার আবার ক্ষমতায় এলে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ডানপন্থী মিত্রদের চাপ আরও বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহু সরকারের কয়েকজন ডানপন্থী মন্ত্রী গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায়’ অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন।
তবে শুধু নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট নয়, বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকটকে নিয়েও গাজার মানুষের প্রত্যাশা সীমিত। সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট বর্তমানে ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তার নেতৃত্বাধীন ইয়াশার দল সাম্প্রতিক জরিপে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে কোনো দল বা জোট এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করেছে—এমন চিত্র এখনো নেই।
গাজার বাসিন্দাদের কাছে সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাবার, ওষুধ, আশ্রয় ও নিরাপত্তার বিষয়ও। মরিয়ম জানান, গাজায় এখনো ওষুধ, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট রয়েছে। তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়গুলোও তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
গাজা সিটিতে বোমা হামলায় পরিবারের নয় সদস্য নিহত হওয়ার পর ৬৫ বছর বয়সী ওসামা আল-আরবাইও যুদ্ধের মধ্যে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বর্তমানে একটি স্কুলে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা ওসামার মতে, ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন হলেও গাজার পরিস্থিতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ওসামার এখন কোনো আয় নেই। তার কাছে নির্বাচনের ফলাফলের চেয়ে খাবারের দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কাজের সুযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, গাজায় খাবার এখনো অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল। এরপরও গাজা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন না তিনি।
উত্তর গাজার শেখ জায়েদ এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত ৫৯ বছর বয়সী উম্মে মোহাম্মদ খলিলও ইসরায়েলের নির্বাচন নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন। তার পরিবারের ১৯ জন সদস্যের দায়িত্ব তার ওপর। তার ছেলে ও জামাতা নিখোঁজ। এখন তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, নির্বাচনের পর গাজায় আবারও সহিংসতা বাড়বে কি না।
ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচারণায় গাজা যুদ্ধ অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরের সহিংসতা, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত, অর্থনীতি এবং অতিধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক দায়িত্বের মতো বিষয়ও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো দল এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করলে জোট গঠনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে হয়। ফলে ২৭ অক্টোবরের ভোটের পর কোন দল বা দলগুলো সরকার গঠন করবে এবং সেই সরকারের নীতিতে গাজার বিষয়ে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—তা নির্ভর করবে পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
গাজার বাসিন্দাদের কাছে তাই ইসরায়েলের নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নয়। তাদের কাছে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফেরার সুযোগ, খাবার ও ওষুধের প্রাপ্যতা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন।
মরিয়ম আল-দাবালা, ওসামা আল-আরবাই ও উম্মে মোহাম্মদ খলিলের বক্তব্যে একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে—ইসরায়েলে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও গাজার মানুষের জীবনে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা কতটা বদলাবে, সেটিই এখন তাদের বড় প্রশ্ন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন