কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাহিদুর রহমান তুহিন ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্য। তাঁদের সন্ধান না পেয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্বজন, সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা।
নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিন, তাঁর স্ত্রী আফসানা এবং তাঁদের দুই মেয়ে—সাত বছর বয়সী রোবাইনা ও তিন বছর বয়সী সুনাইনা।
নাহিদুর ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন।
স্বজনদের ভাষ্য, নাহিদুর ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ইনানীর ওই রিসোর্টে একটি কক্ষ বুকিং দিয়েছিলেন। বুকিংয়ের বিলের তথ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর কক্ষটি বুকিং করা হয়। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাঁদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে নাহিদুর বা তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। এরপর থেকেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
জাহিদুর রহমান প্রিন্স সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর ভাই শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। শনিবার রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তিনি নাহিদুরকে ফোন করেন। কিন্তু তাঁর ভাই কিংবা পরিবারের অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নাহিদুরের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামান বর্তমানে চীনে রয়েছেন। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর শোনার পর তিনিও প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে নিয়ে নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি।
তিনি বলেন, “খবরটি শোনার পর থেকেই আমি খুব অসহায় বোধ করছি। নাহিদ খুব ভালো কর্মকর্তা ছিলেন।”
নাহিদুর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাহিরা সিদ্দিকা সূচী, যিনি নাহিদুরকে বড় ভাই হিসেবে উল্লেখ করেন, জানান, নাহিদুরের পরিবারের সদস্যরা চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা বাড়িতে বসে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে উখিয়া উপজেলার মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন ইনানীর পাটুয়ার টেক এলাকায় অবস্থিত রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বলেন, প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রিসোর্টের শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন শিশু ও দুজন নারী ছিলেন।
তিনি বলেন, “কারও চেহারা দেখে পরিচয় বোঝার উপায় নেই। আমরা মরদেহগুলো উখিয়া থানার কাছে বুঝিয়ে দিয়েছি। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মরদেহ শনাক্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, নাহিদুর নিখোঁজ রয়েছেন বলে তাঁরা তথ্য পেয়েছেন। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি চারজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় নাহিদুর ও তাঁর পরিবারের কারও নাম পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাহিদুর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে এখন ডিএনএ পরীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন