নোয়াখালী পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে শরন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অব্যাহতি দিয়ে ঢাকার উত্তরাভিত্তিক ‘ইনোভেশন সেবা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কোনো পূর্ব নোটিশ, কারণ দর্শানোর সুযোগ কিংবা লিখিত ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে শরন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নতুন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া, যোগ্যতা ও পরিবেশগত অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শরন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিচালক মো. আবুল বাশারের অভিযোগ, বৈধ নিবন্ধন, লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁর প্রতিষ্ঠানকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, দায়িত্ব অব্যাহত রাখার শর্তে টাকা দাবি এবং এ-সংক্রান্ত একটি আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যের সঙ্গে আবুল বাশারের বক্তব্যের অমিল রয়েছে।
নিবন্ধন ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শরন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার রেজিস্ট্রেশন নম্বর 750121 এবং লাইসেন্স নম্বর L2030201007654-H। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. আবুল বাশার। তিনি নোয়াখালী উদ্যোক্তা ও পণ্য উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেডের (রেজি. নং: ০৩/২৩ নোয়া) সাধারণ সম্পাদক এবং শরন পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (রেজি. নং: নোয়া-৭৯৭) সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানিয়েছেন।
আবুল বাশারের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁর প্রতিষ্ঠানকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পরিবর্তে ইনোভেশন সেবাকে পৌর এলাকার বর্জ্য অপসারণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে ইনোভেশন সেবার নিবন্ধন বা পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই—এমন অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, অনুমোদনপত্র, কার্যাদেশ ও চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টাকা লেনদেন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
শরন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিচালক আবুল বাশার অভিযোগ করেন, নোয়াখালী পৌরসভার কনজারভেন্সি সুপারভাইজার আব্দুল ওহাব তাঁর কাছে কাজ অব্যাহত রাখার শর্তে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দাবিকৃত অর্থের পুরোটা দিতে না পারায় ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর সকাল ৯টা ৫১ মিনিটে তিনি আব্দুল ওহাবের বিকাশ নম্বরে ১০ হাজার টাকা পাঠান।
আবুল বাশারের দাবি, ওই অর্থ দেওয়ার পরও একই দিন সভা ডেকে শরন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বাদ দিয়ে ইনোভেশন সেবাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে এ অভিযোগের পক্ষে অর্থ লেনদেনের রেকর্ড, সভার কার্যবিবরণী কিংবা সিদ্ধান্তসংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অন্যদিকে, আব্দুল ওহাব টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে টাকা নেওয়ার পেছনে অনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, আবুল বাশার তাঁর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন এবং পরে বিকাশের মাধ্যমে তা পরিশোধ করেছেন।
ফলে একই লেনদেনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে। অর্থটি ধার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে লেনদেন হয়েছিল, তা নিশ্চিত করতে লেনদেনের রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের স্মারক নিয়ে আলোচনা
আবুল বাশারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জেলা জিওএনজিও সভায় উত্থাপন করা হয়। সভার রেজুলেশনে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে নোয়াখালী পৌরসভার প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া ইনোভেশন সেবার বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে স্মারক নম্বর ২২.০২.৭৫০০.২১২.৬০.০৩২.২৫-৬৬-এর মাধ্যমে অনাস্থা প্রকাশ করেছে বলে দাবি করেন আবুল বাশার।
তবে ওই স্মারকের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য, প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক তাৎপর্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্মারকটিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার আগে মূল নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ
দায়িত্ব হারানোর কারণে প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এর অধীনে কর্মরত শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছে শরন কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোটি টাকার বিনিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।
তবে বিনিয়োগের পরিমাণ, কর্মীর সংখ্যা এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
পৌর কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা জরুরি
নোয়াখালী পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সেবা পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পরিবেশগত বিধিবিধান অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় শরন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের লিখিত ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট সভার কার্যবিবরণী, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র এবং নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পৌর প্রশাসক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ইনোভেশন সেবার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। অন্যদিকে, অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি।
সব পক্ষের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হলে নোয়াখালী পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জনআস্থা নিশ্চিত করার পথ সুগম হতে পারে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন