রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্লাড ব্যাংক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে গত পাঁচ মাসে সারা দেশে ২৫০টির বেশি অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ২৯ মার্চ থেকে অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধে নিয়মিত অভিযান শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। বিভিন্ন অভিযানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নূরুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, এরই মধ্যে সারা দেশে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ ও মানহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্লাড ব্যাংক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টির বেশি অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রায় ২০০টি ক্লিনিককে প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদেরও নবায়নের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬ হাজার ক্লিনিক লাইসেন্স নবায়ন করেছে। আরও ২ থেকে ৩ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফেরাতে অভিযান
ডা. নূরুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মানুষের আস্থা বাড়ানো এবং নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম ও নিম্নমানের চিকিৎসাসেবার অভিযোগ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১ হাজার ২৮৫টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি প্রতিষ্ঠান ছিল ঢাকা বিভাগে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহে ২৫২টি, চট্টগ্রামে ২৪০টি, রংপুরে ১১১টি, খুলনায় ১৫৬টি, রাজশাহীতে ৫৫টি, বরিশালে ৪৮টি এবং সিলেটে ৮টি অবৈধ প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা হয়েছিল।
বিভিন্ন জেলায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে রাজধানীতে প্রায় ২৫টি অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। পরিদর্শনের সময় গুরুতর অনিয়ম পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা, বন্ধ এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ফরিদপুরে চারটি বেসরকারি হাসপাতাল ও একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, টাঙ্গাইলে ছয়টি অনুমোদনহীন ক্লিনিক, শরীয়তপুরে দুটি ক্লিনিক, নরসিংদীতে দুটি, পাবনায় দুটি ক্লিনিক এবং মানিকগঞ্জে দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডে একটি এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে একটি ক্লিনিকসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।
কোনো ছাড় দেওয়া হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, রাজধানী থেকে শুরু হওয়া অভিযান ধাপে ধাপে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। অবৈধভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভুয়া চিকিৎসক-নার্সের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বাসসকে বলেন, দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর অনিয়ম দূর করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে।
অভিযানের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স যাচাই, চিকিৎসা সরঞ্জামের মান পরীক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং চিকিৎসকদের বৈধ সনদপত্র যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা, সিলগালা অথবা কার্যক্রম বন্ধের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন