সুন্দরবনে ফাঁদে আটকে আহত হওয়ার পর দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসায় সুস্থ করে গত ১২ জুলাই বাঘিনীটিকে বনে অবমুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম। অবমুক্তির পর বাঘিনীটির গতিবিধি জানতে ৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ক্যামেরা বসানো হলেও এখনো তার দেখা মেলেনি। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বাঘিনীটি হারিয়ে গেছে—এমনটা ভাবার কারণ নেই।
বাঘিনীটিকে নিয়ে মানুষের আগ্রহের কারণে অবমুক্তির পর থেকেই তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে সুন্দরবনের প্রায় ৬৯ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়। দুই দফায় ক্যামেরার ছবি পর্যালোচনা করেও অবমুক্ত করা বাঘিনীটির দেখা পাওয়া যায়নি।
এরপর গত ১ ও ২ আগস্ট ক্যামেরার ছবি যাচাই করে ওই এলাকায় তিনটি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি আগের দেখা বাঘ এবং একটি নতুন বাঘ। অর্থাৎ ওই এলাকায় মোট চারটি বাঘের বিচরণ শনাক্ত হয়েছে। অবমুক্ত করা বাঘিনীটি অবশ্য তখনও ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। পরে আরও ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, ১৮ জুলাই ক্যামেরা পরীক্ষা করে পূর্ণবয়স্ক তিনটি বাঘের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি স্ত্রী বাঘ এবং অপরটির লিঙ্গ শনাক্ত করা যায়নি। তবে অবমুক্ত করা বাঘিনীটির দেখা মেলেনি।
তিনি বলেন, পরবর্তী পর্যায়ে আরও ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ক্যামেরাগুলো পরীক্ষা করলে বাঘিনীটির অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
নতুন এলাকায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনের প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে গড়ে ২ দশমিক ৬৪টি বাঘ পাওয়া গেছে। বাঘিনীটিকে যে এলাকায় অবমুক্ত করা হয়েছে, সেখানে এরই মধ্যে একাধিক বাঘের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ফলে বাঘিনীটি সুন্দরবনের অন্য কোনো এলাকায় নিজের বিচরণক্ষেত্র তৈরি করে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, বাঘ সাধারণত নিজের বিচরণ এলাকায় অন্য বাঘের উপস্থিতি সহজে মেনে নেয় না। কোনো বাঘ দলছুট হয়ে ফিরে এলেও তাকে আগের এলাকায় অন্য বাঘের সঙ্গে থাকতে নাও দেওয়া হতে পারে। তাই নতুন বাঘের উপস্থিতির কারণে অবমুক্ত করা বাঘিনীটি অন্য এলাকায় সরে গিয়ে থাকতে পারে।
বাঘ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক খসরু চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে বাঘ তার আবাস এলাকা পরিবর্তন করে। বাচ্চা বাঘ বড় হলে মা তাদের নিজের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়। তখন তারা নতুন এলাকা খুঁজে নেয়। আবার কোনো এলাকায় নতুন বাঘের আগমন ঘটলে পুরোনো বাঘ কম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকায় চলে যেতে পারে। শিকারের পরিমাণ কমে গেলেও খাবারের সন্ধানে বাঘ অন্য এলাকায় চলে যায়।
ক্যামেরায় দেখা না গেলেই নিখোঁজ নয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, বিশাল সুন্দরবনের একটি সীমিত এলাকায় ক্যামেরা বসিয়ে কোনো বাঘকে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। ক্যামেরায় দেখা না গেলেই বাঘটি হারিয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়।
তার মতে, পরবর্তী বাঘ জরিপে বিস্তৃত এলাকায় ক্যামেরা বসানো হলে বাঘিনীটির অবস্থান শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যেভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল বাঘিনীকে
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের শরকির খাল এলাকায় একটি বাঘ ফাঁদে আটকে থাকার খবর পায় বন বিভাগ। এলাকাটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন।
পরদিন ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন করা হয়। পরে ফাঁদের রশি কেটে তাকে লোহার খাঁচায় করে খুলনায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
ফাঁদের রশিতে আটকে বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি অংশের চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং পচন ধরতে শুরু করে।
দীর্ঘ ছয় মাস চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর গত ১২ জুলাই আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের অদূরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীর তীরে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, দেশের খ্যাতনামা বন্যপ্রাণী চিকিৎসক, দেশি-বিদেশি গবেষকদের পরামর্শ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ ছয় মাসের প্রচেষ্টায় বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে ওঠে। এটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি নতুন অভিজ্ঞতা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন