ট্যুরিস্ট হিসেবে বাংলাদেশে এসে অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছেন চীনা নাগরিকদের কেউ কেউ। মাদক, নারী পাচার ও অনলাইন প্রতারণার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। দেশীয় কিছু ব্যক্তির সহযোগিতায় রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তুলছেন এসব নেটওয়ার্ক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে চীনা নাগরিকদের গ্রেফতারের পর তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য সামনে এসেছে।
কিটামিনের ল্যাব, ডার্ক ওয়েবে মাদকের অর্ডার
গত ৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে সন্দেহজনক একটি পার্সেল আটক করা হয়। পরে একটি ব্লুটুথ স্পিকারের ভেতর বিশেষ কৌশলে লুকানো ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয়।
এর সূত্র ধরে ওই দিন রাতে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিক—লি বীন, ইয়াং চুনহিং ও ইয়ো ঝিকে আটক করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানায়, তাদের ব্যবহৃত ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে অস্থায়ী ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ কিটামিন, বিভিন্ন রাসায়নিক, ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্র, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ল্যাবে তা পাউডারে রূপান্তর করা হতো। পরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হতো।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক মেহেদি হাসান জানান, চক্রটি ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার নিত। অর্থ লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সিও ব্যবহার করা হতো।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের ভ্রমণ ইতিহাসে দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন দেশে স্বল্প সময় অবস্থান করে ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করতেন। এতে তাদের কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অনলাইন প্রতারণায় চীনা নাগরিক
গত ২ আগস্ট রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভিওআইপি, জিএসএম গেটওয়ে ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে ডিবি।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন চীনের নাগরিক লিউ হুই জাং, ওয়ে ইউজি ও শে ই রান। তাদের কাছ থেকে ১৪টি ল্যাপটপ, ১৬টি স্মার্টফোন, ৬ হাজারের বেশি সক্রিয় সিমকার্ড, ২০টি জিএসএম গেটওয়ে ডিভাইসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
ডিবি সূত্র জানায়, চীনা নাগরিকরা একটি ভবনের কয়েকটি তলা ভাড়া নিয়ে সেখানে অবৈধ ভিওআইপি ও অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। বিভিন্ন ব্যক্তিকে চাকরি, বিশেষ অফার ও অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মেসেজ পাঠানো হতো। পরে মেসেজের লিংকে প্রবেশ করিয়ে তাদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো।
ডিবির কর্মকর্তারা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করত চক্রটি।
বিয়ের ফাঁদে নারী পাচারের চেষ্টা
চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে নারী পাচারের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর বিয়ে ও প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে দুই বাংলাদেশি নারীকে চীনে নেওয়ার চেষ্টার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়।
এরপর একই বছরের ডিসেম্বরে এক নারীকে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে আরও দুই চীনা নাগরিক গ্রেফতার হন। ২০২৫ সালের মে মাসেও একই ধরনের অভিযোগে আরও দুই চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়।
এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সূত্র জানায়, এসব চক্রের সদস্যরা রাজধানীর নিকুঞ্জ, উত্তরা ও বসুন্ধরা এলাকায় অবস্থান করে দেশীয় দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামের তরুণীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বিয়ের প্রস্তাব ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখানো হতো।
অন-অ্যারাইভাল ভিসায় এসে অভিজাত এলাকায় অবস্থান
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গুলশান, উত্তরা, বসুন্ধরা ও নিকুঞ্জ এলাকায় এসব চক্রের সদস্যদের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামেও তাদের অবস্থান ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার হওয়া অনেক চীনা নাগরিকই ট্যুরিস্ট হিসেবে অন-অ্যারাইভাল ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাদের ভিসার মেয়াদ সাধারণত দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ছিল।
ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, স্বল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে এসে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পর অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। পরে অন্য একটি দল এসে একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালায়।
দেশীয় সহযোগীদের নিয়েও উদ্বেগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অপরাধে চীনা নাগরিকদের পাশাপাশি দেশীয় কিছু ব্যক্তি সহযোগিতা করছেন। বাসা ভাড়া নেওয়া, স্থানীয় যোগাযোগ তৈরি, ভুক্তভোগী সংগ্রহ কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনা নাগরিকদের অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দেশীয় সহযোগীদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি নাগরিকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন