ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার হওয়া আফগান নাগরিক হাসমত মোহাম্মদীর মরদেহ দাফনের প্রায় পাঁচ মাস পরও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নিতে আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশে এসে ৫০ দিন ধরে অপেক্ষা করছেন তার ভাই ইমাল মোহাম্মদী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি মিললেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের প্রক্রিয়া আটকে আছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও পরিচয়-প্রমাণ নিয়ে ঝিনাইদহে পৌঁছান ইমাল মোহাম্মদী। তিনি জানান, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ভাইয়ের মরদেহ নিজ দেশে নিয়ে দাফন করাই পরিবারের একমাত্র চাওয়া। কিন্তু দাপ্তরিক জটিলতার কারণে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
যেভাবে উদ্ধার হয়েছিল মরদেহ
মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান জানান, গত ১৩ এপ্রিল মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তসংলগ্ন ইছামতী নদী থেকে একটি অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি।
পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মরদেহের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারে পরীক্ষা করে। তবে কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
এরপর মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে ১৪ এপ্রিল আনজুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় মহেশপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মরদেহের ছবি দেখে স্বজনেরা শনাক্ত করেন, নিহত ব্যক্তি আফগানিস্তানের কাবুলের পাঞ্জশির এলাকার কুন্ডুস গ্রামের ইয়াসিন মোহাম্মদী ও সকিনা মোহাম্মদীর ছেলে হাসমত মোহাম্মদী।
দেশে নিতে গিয়ে দাপ্তরিক জটিলতা
হাসমতের মৃত্যুর খবর পেয়ে তার লন্ডনপ্রবাসী ভাই মীর ওয়াইস মোহাম্মদী লন্ডন থেকে বাংলাদেশে এসে মরদেহ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে আইনি জটিলতার কারণে তিনি মরদেহ নিতে না পেরে ফিরে যান।
এরপর দাফনের চার মাস ২৪ দিন পর সোমবার আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মদী ডিএনএ পরীক্ষার নথি, মন্ত্রণালয়ের চিঠি, পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি নিয়ে ঝিনাইদহে আসেন।
হাসমত মোহাম্মদীর বাংলাদেশি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাসুম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখা-১-এর উপসচিব কাজী আরিফুর রহমান গত ১১ আগস্ট পররাষ্ট্রসচিব, ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে চিঠি দেন। এতে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে আফগানিস্তানে পাঠানোর বিষয়ে অনাপত্তি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক চিঠি না পাওয়ায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মরদেহ উত্তোলনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিহত ব্যক্তি যেহেতু বিদেশি নাগরিক, তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তির পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক নির্দেশনাও প্রয়োজন। সেটি না পাওয়া পর্যন্ত মরদেহ উত্তোলন ও হস্তান্তর সম্ভব নয়।
ভাইয়ের আকুতি
ঝিনাইদহের একটি রেস্তোরাঁয় অবস্থানরত ইমাল মোহাম্মদী অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে শুধু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মরদেহটি দেশে নিয়ে দাফনের সুযোগ চাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টে আছেন।
আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মাসুম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফিরতি চিঠির অপেক্ষা করা হচ্ছে। মানবিক দিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে তারা আশা করছেন।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, তারা সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেলে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন