বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির সুপারকম্পিউটারের তালিকায় আবারও শীর্ষস্থান দখল করেছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে প্রভাবশালী ‘টপ ৫০০’ তালিকার এক নম্বরে উঠে এসেছে চীনের সুপারকম্পিউটার ‘লাইনশাইন’।
জার্মানির হামবুর্গে মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক ‘টপ ৫০০’ র্যাংকিংয়ে এই তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (২৪ জুন) এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানিয়েছে কাতারের সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘এল ক্যাপিটান’কে পেছনে ফেলেছে লাইনশাইন
সর্বশেষ ‘টপ ৫০০’ তালিকা অনুযায়ী, চীনের শেনঝেনের ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টারে থাকা ‘লাইনশাইন’ ২ দশমিক ১৯৮ এক্সাফ্লপস পারফরম্যান্স অর্জন করেছে।
এক্সাফ্লপস হলো সুপারকম্পিউটারের বিপুল পরিমাণ গণনাশক্তি পরিমাপের একটি একক। ১ কুইন্টিলিয়ন মানে ১০-এর ওপর ১৮টি শূন্য। অর্থাৎ লাইনশাইন প্রতি সেকেন্ডে ২ কুইন্টিলিয়নেরও বেশি জটিল হিসাব সম্পন্ন করতে পারে।
পারফরম্যান্সের দিক থেকে চীনের এই সুপারকম্পিউটারটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘এল ক্যাপিটান’-এর তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার লিভারমোরে অবস্থিত লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ‘এল ক্যাপিটান’ ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বিশ্বের দ্রুততম সুপারকম্পিউটারের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল।
২০১৭ সালের পর আবারও শীর্ষে চীন
২০১৭ সালে চীনের ‘সানওয়ে তাইহুলাইট’ শীর্ষস্থান দখল করার পর এই প্রথম কোনো চীনা সুপারকম্পিউটার বিশ্বের এক নম্বরে উঠে এলো।
সর্বশেষ তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ‘ফ্রন্টিয়ার’। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ইলিনয়ের আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ‘অরোরা’। পঞ্চম স্থানে রয়েছে জার্মানির জুলিখ সুপারকম্পিউটিং সেন্টারের ‘জুপিটার’।
শীর্ষ ২০-এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডের সুপারকম্পিউটারও রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
‘টপ ৫০০’ তালিকার অন্যতম সংগঠক ও টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক জ্যাক ডনগ্যারা মনে করেন, উন্নত চিপের ওপর মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও লাইনশাইনের সাফল্য চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বড় প্রমাণ।
তার মতে, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ চীনের উন্নত চিপ পাওয়ার গতি কিছুটা কমিয়ে দিলেও দেশটিকে নিজস্ব বিকল্প প্রযুক্তি তৈরিতে আরও উৎসাহিত করেছে। বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের সমন্বিত নকশার মাধ্যমে চীন এর জবাব দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জিপিইউ ছাড়াই ২ এক্সাফ্লপসের বেশি গতি
লাইনশাইনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটির মতো মডেল পরিচালনায় ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতার গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) ব্যবহার না করে এটি জেনারেল-পারপাস সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (সিপিইউ)-ভিত্তিক প্রযুক্তিতে তৈরি।
কেবল সিপিইউ ব্যবহার করে ২ এক্সাফ্লপসের বেশি পারফরম্যান্স দেখানো বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র সিস্টেম হিসেবে এটিকে উল্লেখ করা হয়েছে।
এআই প্রতিযোগিতায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই
১৯৯৩ সাল থেকে বছরে দুইবার ‘টপ ৫০০’ তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে। লিনপ্যাক বেঞ্চমার্ক ব্যবহার করে সুপারকম্পিউটারগুলোর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হয়।
একসময় এই তালিকায় চীনের আধিপত্য ছিল। ২০১৯ সালে তালিকার প্রায় অর্ধেক সুপারকম্পিউটারই ছিল চীনের। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের অবনতির মধ্যে র্যাংকিংয়ে চীনের অংশগ্রহণ কমে যায়।
কম্পিউটিং শিল্পবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারসেক্ট৩৬০ রিসার্চ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডিসন স্নেল বলেন, লাইনশাইনের সক্ষমতা তাকে অবাক করেনি। তবে চীনা ডেভেলপাররা আবারও এই র্যাংকিং প্রকল্পে অংশ নিতে শুরু করায় বিষয়টিকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের কারণে ‘টপ ৫০০’ তালিকার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সুপারকম্পিউটিংয়ে দেশগুলোর সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে এটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক।
এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। একে অপরের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ঠেকাতে দুই দেশই বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘২০২৬ এআই ইনডেক্স রিপোর্ট’ অনুযায়ী, এআই মডেলের পারফরম্যান্সে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বেশি সংখ্যক শীর্ষ মানের এআই মডেল তৈরি করলেও পেটেন্ট এবং শিল্পখাতে রোবট স্থাপনের ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে রয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন