জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—সব ক্ষেত্রেই নজরুল ছিলেন মূল অনুপ্রেরণা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান রুহুল কবির রিজভী। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—সবকিছুতেই নজরুল মূল অনুপ্রেরণা। তাঁর লেখনী ও বাণী মানুষকে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এবং নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়।
তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করলে নজরুলের বাণী মানুষকে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। যেকোনো অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি জোগান তিনি।
রিজভী আরও বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আমাদের শক্তির একটি উৎস। তাঁর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।’
তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের মতো মহীরুহ প্রতিভার সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে যে চর্চা ও অনুশীলন প্রয়োজন, দেশে তা আবার শুরু হয়েছে। নজরুলের লেখনী, সাহিত্যকর্ম ও বাণী ধারণ করেই তাঁরা পথ চলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর সময় রিজভীর সঙ্গে ছিলেন বিএনপির সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক সাঈদ সোহরাব, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা—জাসাসের আহ্বায়ক হেলাল খান, সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকনসহ সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
প্রেম ও দ্রোহের কবি নজরুল
বাংলা ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। শৈশবেই পিতাকে হারানো নজরুল গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য সেখানে শিক্ষকতা ও মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে কবিতা ও গান রচনায় নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন নজরুল। আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন বারবার বাধাগ্রস্ত হলেও সাহিত্য ও সংগীতচর্চা থেমে থাকেনি।
১৯১৭ সালের শেষ দিকে স্কুল ছেড়ে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন নজরুল। প্রায় আড়াই বছর পর সামরিক জীবন শেষে তিনি সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। ব্রিটিশবিরোধী চেতনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণে তাঁর কবিতা-লেখা তৎকালীন সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ব্রিটিশবিরোধী লেখার জন্য তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়।
একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’, ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’, ‘ব্যথার দান’ ও ‘মৃত্যুক্ষুধা’সহ বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম।
সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীতেও নজরুল অসামান্য অবদান রাখেন। শ্যামাসংগীত, ইসলামী গান ও গজলসহ বিভিন্ন ধারার সংগীতে তাঁর সৃষ্টিশীলতা বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
নজরুল ছিলেন কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান অনন্য।
১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে ধীরে ধীরে বাকশক্তি হারান নজরুল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে তাঁকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। পরে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশেষ সমাবর্তনের মাধ্যমে নজরুলকে সম্মানসূচক ‘ডিলিট’ ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। জাতীয় মর্যাদায় তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের উত্তর পাশে সমাহিত করা হয়।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন