মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা একটি চালানে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির বড় বড় অংশ শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। শনাক্ত হওয়া গাড়িগুলো হলো—রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট। গাড়ি চারটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি।
কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাড়িগুলো সম্পূর্ণ অবস্থায় না এনে তিন-চারটি বড় অংশে কেটে আলাদা ‘কার পার্টস’ হিসেবে চালানটি আমদানি করা হয়েছে। তবে এসব অংশের সঙ্গে তার, সেন্সরসহ গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত ছিল। কাস্টমস গোয়েন্দার মতে, অংশগুলো জোড়া দিলে গাড়িগুলোর মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা সম্ভব।
চালানটির আমদানিকারক ঢাকার ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এস টি ইন্টারন্যাশনাল। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে চালানটি মোংলা বন্দরে আসে।
চালানটির বিল অব এন্ট্রি (বিই) নম্বর সি-৬৯০৪। এতে ১৪ ধরনের পণ্যের ১৬৪টি প্যাকেজের মোট ওজন প্রায় ১০ হাজার ২২০ কেজি দেখানো হয়। ঘোষণায় ব্যবহৃত দরজা, ২ হাজার সিসি পেট্রল ইঞ্জিনসহ গিয়ার অ্যাসেম্বলি, সাসপেনশন শক অ্যাবজর্বার, নোজ কাট, হেডলাইট, টেইল লাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং হুইল, বাম্পার, এয়ার ক্লিনার বক্স, রাবার চ্যানেল, ডিফারেনশিয়াল ও অ্যাক্সেল অ্যাসেম্বলিসহ বিভিন্ন ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ দেখানো হয়।
তবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানটির খালাস স্থগিত করে কাস্টমস গোয়েন্দা। গত ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। এ সময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়।
পণ্যের গায়ে থাকা স্টিকার, লেবেল, বিভিন্ন চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
যন্ত্রাংশের বদলে গাড়ির বড় অংশ
কায়িক পরীক্ষায় ঘোষিত আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশের সঙ্গে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশ সংযুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর মধ্যে ছিল ফ্রন্ট কাট, সম্পূর্ণ রিয়ার বা টেইল কাট, ফ্রন্ট ও রিয়ার বডি কাট এবং ছাদসহ বডি প্যানেল অ্যাসেম্বলি।
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অংশ সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের মতো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং গাড়িগুলোকে কয়েকটি বড় অংশে কেটে এনে ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের কারিগরি মতামত ও পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চারটি গাড়ির পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগ যুক্তরাজ্যের তৈরি। গাড়িটির ভিআইএন নম্বর এসএএলজিএ২ইই৯এইচএ৩৬৫৬০৯। বাংলাদেশে গাড়িটির আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
আরেকটি গাড়ি ২০১০ সালের বিএমডব্লিউ ৬৫০আই। জার্মানিতে তৈরি গাড়িটির ভিআইএন নম্বর ডব্লিউবিএএলজেড৩২০এক্স০সি৫৭৮৮৮০। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।
চালানে পাওয়া তৃতীয় গাড়িটি ২০১৬ সালের লেক্সাস এলএক্স৫৭০। জাপানে তৈরি এ গাড়িটির চেসিস নম্বর ইউআরজে ২০১-৪২০৪৩০০। বছর ও অবস্থাভেদে বাংলাদেশে এর আনুমানিক বাজারমূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
চতুর্থ গাড়িটি টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট জিআরএস ২০৪। জাপানে তৈরি গাড়িটির চেসিস বা ভিআইএন নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি।
ঘোষিত মূল্য মাত্র ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা
চারটি গাড়ির বড় অংশকে ১৪ ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে দেখিয়ে পুরো চালানের ইনভয়েস মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। ঘোষিত বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় চালানটির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা।
এই ঘোষণার ভিত্তিতে শুল্ক-কর দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৩৯৬ টাকা। ডিএফ, সিভিএটি ও এফপি বাবদ আরও ২ হাজার ৬৩৩ টাকা ৩৬ পয়সাসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা ২ পয়সা।
অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৪ কোটি থেকে সাড়ে ৬ কোটি টাকা বা তারও বেশি সম্ভাব্য বাজারমূল্যের গাড়ির অংশকে এমনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
তবে এতে সরকারের প্রকৃত কত টাকার রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কাস্টমস গোয়েন্দা জানিয়েছে, গাড়িগুলোকে প্রকৃতপক্ষে খণ্ডিত অবস্থায় আমদানি করা সম্পূর্ণ মোটরযান বা এসকেডি (সেমি নকড ডাউন) হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হলে প্রযোজ্য শুল্ক-কর নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। এরপরই সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির প্রকৃত অঙ্ক জানা যাবে।
এসকেডি গাড়ি হিসেবে শুল্কায়নের সুপারিশ
কাস্টমস গোয়েন্দার প্রতিবেদনে পণ্যের প্রকৃতি বিবেচনায় জেনারেল রুলস ফর দ্য ইন্টারপ্রিটেশন অব দ্য হারমোনাইজড সিস্টেমের (জিআরআই) ২(এ) বিধানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এ বিধান অনুযায়ী, অসম্পূর্ণ বা খণ্ডিত অবস্থায় আমদানি করা কোনো পণ্যে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবেই শ্রেণিবিন্যাস করা যায়।
কাস্টমস গোয়েন্দার মতে, পরীক্ষায় পাওয়া গাড়ির অংশগুলোর প্রকৃতি ও বিন্যাস বিবেচনায় এসব চালানে সম্পূর্ণ মোটরযানের ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান থাকার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে। সে কারণে ‘ইউজড কার পার্টস’ নয়, এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ ক্ষেত্রে আমদানি নীতি আদেশ, ২০২১–২৪, আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৫০ এবং কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর প্রযোজ্য বিধান পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ১৯৯৭ সালের সংশ্লিষ্ট নথিতে থাকা শর্ত ভঙ্গের বিষয়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর চালানটি এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের মতামতসহ প্রতিবেদন কাস্টম হাউস, মোংলায় পাঠিয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে যথাযথ শুল্কায়ন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার মধ্য দিয়ে গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণা ব্যবহার করে খণ্ডিত অবস্থায় সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ গাড়ি আমদানির একটি সম্ভাব্য কৌশলও নজরে এসেছে। কাস্টমস গোয়েন্দা জানিয়েছে, মিথ্যা ঘোষণা, প্রকৃত পণ্যের পরিচয় গোপন এবং শুল্ক-কর ফাঁকি ঠেকাতে এ ধরনের চালানের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন