কর্ণফুলী নদীর তীরে ছোট্ট লালদিয়া চর। এতদিন বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যে বড় কোনো পরিচিতি ছিল না জায়গাটির। তবে এবার বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন পরিচয় পেতে যাচ্ছে লালদিয়া। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস সেখানে গড়ে তুলছে আধুনিক গ্রিনফিল্ড কন্টেনার টার্মিনাল।
প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিতব্য এই টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতায় বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস (TEUs) অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের পরিবহন সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালস এবং স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কন্টেনার সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান টার্মিনালটির নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে জমির মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। প্রকল্পটির কনসেশন মেয়াদ ৩০ বছর। নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।
থাকবে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম
প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো। নকশা অনুযায়ী লালদিয়া টার্মিনালে থাকবে সাতটি শিপ-টু-শোর (STS) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টাইয়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (ERTG) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর।
এ ছাড়া থাকবে ৬১৩ মিটার দীর্ঘ কন্টেনার জেটি। টার্মিনালটি ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিংয়ের উপযোগী করে নির্মাণ করা হবে। সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কন্টেনার জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ থাকবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এপিএম টার্মিনালসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন, টার্মিনালটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন টার্মিনাল’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ক্রেনগুলো অফিস থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও জানানো হয়েছে।
বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ
লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হতে পারে বড় আকারের কন্টেনার জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আকার নিয়ে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বড় কন্টেনার জাহাজের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
নতুন টার্মিনালে প্রায় ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলে ফিডার জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। এতে সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুরো প্রকল্পটি বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মাণ ও পরিচালিত হবে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে মূলধনী বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দেশে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আর্থিক সুবিধা পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ
লালদিয়া টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ৮ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত প্রতিটি কন্টেনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২১ মার্কিন ডলার এবং ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত প্রতিটি কন্টেনারে ২৩ ডলার করে পাবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর এককালীন ২৫০ কোটি টাকা দেওয়ার কথাও রয়েছে। তবে প্রকল্পটির বাণিজ্যিক চুক্তির সব শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলে আগ্রহ
লালদিয়া টার্মিনালকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, বিশ্বখ্যাত একটি টার্মিনাল অপারেটরের সরাসরি বিনিয়োগ বাংলাদেশের বন্দর খাতে বিদেশি বিনিয়োগের আস্থা বাড়াতে পারে।
চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো উচিত। বিশ্বের একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বাংলাদেশে গ্রিনফিল্ড প্রকল্প করছে—এটি দেশের জন্য গৌরবের বিষয়। তার মতে, লালদিয়া প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন অপারেটরের সেবার মান ও ব্যয়ের তুলনা করার সুযোগ তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের জন্য ভালো সেবা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
ব্যবসায়ী নেতা খায়রুল আলম সুজন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। এতে ব্যবসায়ীরা কম সময়ে এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ভালো সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আধুনিক কন্টেনার টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। লালদিয়া টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা ও ব্যয়-প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি মনে করেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় ‘গ্রিন টার্মিনাল’ তৈরির লক্ষ্য
এপিএম টার্মিনালসের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাও প্রকল্পটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে টার্মিনাল পরিচালনা করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দক্ষ কন্টেনার বন্দরের ১০টিতে এপিএম টার্মিনালসের কার্যক্রম রয়েছে।
লালদিয়া টার্মিনালকে দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক, কম কার্বন নিঃসরণ ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী টার্মিনালের একটি প্রদর্শনী প্রকল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
বাড়তে পারে কর্মসংস্থান
লালদিয়া প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশলসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য দ্রুত ও সময়মতো পণ্য পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ।
বড় জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে ভেড়ানোর সুযোগ এবং দ্রুত কন্টেনার ওঠানামা করা গেলে পণ্য পরিবহনে অপেক্ষার সময় কমতে পারে। একই সঙ্গে ডুয়েল টাইম ও লজিস্টিক ব্যয় কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির নির্মাণ ও পরিচালন পর্যায়ে সরাসরি ৫০০ থেকে ৭০০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি নির্মাণ, ট্রাকিং, গুদামজাতকরণ, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ও সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায় কয়েক হাজার মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং লজিস্টিক দক্ষতা বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন