কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বর্তমান দৌড় এতদিন মূলত বড় ডেটা সেন্টার, শক্তিশালী জিপিইউ এবং ক্লাউড কম্পিউটিং অবকাঠামোকেন্দ্রিক ছিল। ব্যবহারকারী কোনো এআই সেবায় প্রশ্ন বা নির্দেশ দিলে তার বড় অংশের হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন হতো দূরের ডেটা সেন্টারে।
এবার সেই চিত্র কিছুটা বদলানোর চেষ্টা করছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। নতুন প্রজন্মের M6 ও M5 Ultra চিপ এবং নতুন Mac mini ও Mac Studio উন্মোচনের মাধ্যমে এমন এক কম্পিউটিং অভিজ্ঞতার দিকে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে এআইয়ের আরও বেশি কাজ সরাসরি ব্যবহারকারীর নিজের কম্পিউটারেই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
এআইকে ক্লাউড থেকে ডেস্কে আনার চেষ্টা
গত ২৫ আগস্ট নতুন M6 ও M5 Ultra প্রসেসর উন্মোচন করেছে অ্যাপল। এর মধ্যে M6 হলো কোম্পানিটির প্রথম ২-ন্যানোমিটার ম্যাক প্রসেসর। অন্যদিকে M5 Ultra-তে চারটি ডাই একসঙ্গে যুক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
অ্যাপলের দাবি, নতুন M6 চিপে রয়েছে ১২-কোর সিপিইউ, ১২-কোর জিপিইউ এবং Neural Accelerators। পাশাপাশি রয়েছে ডুয়াল ১৬-কোর Neural Engine।
কোম্পানিটির নিজস্ব পরীক্ষায় দেখা গেছে, আগের প্রজন্মের তুলনায় Neural Engine-এর সর্বোচ্চ কম্পিউটিং সক্ষমতা দ্বিগুণ পর্যন্ত এবং এআই-সংক্রান্ত জিপিইউ পারফরম্যান্স প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি হতে পারে। তবে এসব ফলাফল অ্যাপলের নিজস্ব বেঞ্চমার্ক; স্বাধীনভাবে এগুলো যাচাই করা হয়নি।
এই পরিবর্তনের গুরুত্ব শুধু দ্রুততর চিপে নয়। মূল বিষয় হলো—এআইয়ের কিছু কাজের জন্য আর সবসময় ক্লাউড সার্ভারে তথ্য পাঠানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে।
ব্যবহারকারীরা নথি বিশ্লেষণ, এআই মডেল পরীক্ষা কিংবা কনটেন্ট তৈরির মতো কিছু কাজ সরাসরি নিজেদের ম্যাকেই করতে পারবেন। সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্থানীয়ভাবে এআই প্রসেসিংয়ের সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাড়ছে Mac mini-এর দাম
অ্যাপলের এআই-কেন্দ্রিক কম্পিউটিং কৌশলের সঙ্গে সামনে এসেছে বাড়তি খরচের বিষয়টিও।
নতুন M6-চালিত Mac mini-এর প্রারম্ভিক দাম হতে পারে ৮৯৯ ডলার, যা আগের মডেলের তুলনায় ১০০ ডলার বেশি। একই সঙ্গে বেস মডেলের ২৫৬ জিবি স্টোরেজ থেকে ১ টেরাবাইটে যেতে অতিরিক্ত ৫০০ ডলার খরচ হতে পারে।
এখানেই অ্যাপলের সামনে বড় প্রশ্ন—ব্যবহারকারীরা কি এআইয়ের বাড়তি সক্ষমতার জন্য বেশি দাম দিতে আগ্রহী হবেন?
এআই যদি দৈনন্দিন কম্পিউটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে অতিরিক্ত দামকে যুক্তিযুক্ত মনে করতে পারেন ক্রেতারা। কিন্তু সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে স্থানীয় এআইয়ের প্রয়োজনীয়তা সীমিত থাকলে শক্তিশালী Neural Engine বা বাড়তি এআই পারফরম্যান্স অনেকের কাছেই শুধু একটি স্পেসিফিকেশন হয়ে থাকতে পারে।
অ্যাপলের সুবিধা কোথায়?
এআই বাজারে অ্যাপলের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত কোনো একটি নির্দিষ্ট এআই মডেল নয়; বরং হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও চিপ—তিনটি স্তরই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
অ্যাপল নিজেই Mac-এর চিপ তৈরি করে, macOS পরিচালনা করে এবং এআই ব্যবহারের জন্য Core ML, Metal ও নতুন Core AI-এর মতো ডেভেলপার ফ্রেমওয়ার্ক সরবরাহ করে।
ফলে একই ডিভাইসে প্রসেসর, অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব।
স্থানীয় এআই ব্যবহারের প্রবণতা শক্তিশালী হলে এটি অ্যাপলকে শুধু নতুন Mac বিক্রি করতেই নয়, ব্যবহারকারীদের আরও দীর্ঘ সময় অ্যাপলের ইকোসিস্টেমে ধরে রাখতেও সহায়তা করতে পারে।
এআই কি ব্যক্তিগত কম্পিউটারের নতুন বিক্রয়-কারণ হবে?
অ্যাপলের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। স্মার্টফোনের পর ব্যক্তিগত কম্পিউটারেও এআই নতুন আপগ্রেড চক্র তৈরি করতে পারে।
এতদিন নতুন কম্পিউটার কেনার প্রধান কারণ ছিল দ্রুত প্রসেসর, উন্নত গ্রাফিক্স, বেশি ব্যাটারি লাইফ কিংবা বড় স্টোরেজ। ভবিষ্যতে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে স্থানীয় এআই প্রসেসিং।
অর্থাৎ, ব্যবহারকারী হয়তো শুধু ‘দ্রুত Mac’ কিনবেন না; বরং এমন একটি কম্পিউটার কিনবেন, যা কিছু এআই কাজ ইন্টারনেট বা দূরের সার্ভারের ওপর কম নির্ভর করে নিজেই সম্পন্ন করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ক্লাউডভিত্তিক এআইয়ের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে। অত্যন্ত বড় এআই মডেল পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন এবং অনেক জনপ্রিয় এআই সেবা এখনো বড় ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।
বরং অ্যাপলের কৌশলকে ক্লাউড এআই ও ব্যক্তিগত এআইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বদলের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এআইয়ের খরচ এবার ভোক্তার পকেটেও
অ্যাপলের নতুন ম্যাকের দাম বৃদ্ধির আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। এআই অবকাঠামোর জন্য বিপুল পরিমাণ জিপিইউ, মেমোরি, স্টোরেজ ও অন্যান্য কম্পিউটিং উপাদানের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
ফলে এআই বুমের প্রভাব শুধু বড় প্রযুক্তি কোম্পানি বা ডেটা সেন্টারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব ধীরে ধীরে সাধারণ ভোক্তার কেনাকাটার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
নতুন ম্যাকের মূল্য সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। অর্থাৎ, এআই বিপ্লবের খরচ শুধু ক্লাউড সাবস্ক্রিপশন বা এআই সেবার বিলের মাধ্যমে নয়, ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হার্ডওয়্যার কেনার মাধ্যমেও ভোক্তাকে বহন করতে হতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে ফলাফলে
অ্যাপলের নতুন কৌশল সফল হবে কি না, তার বড় পরীক্ষা হবে বাজারে। স্থানীয় এআই ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয় হলে শক্তিশালী এআই চিপযুক্ত ম্যাকের জন্য বেশি দাম দিতেও ক্রেতারা রাজি হতে পারেন। এতে ম্যাকের আপগ্রেড চক্র বাড়তে পারে এবং অ্যাপলের প্রিমিয়াম হার্ডওয়্যার ব্যবসা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ ব্যবহারকারীরা যদি স্থানীয় এআইয়ের বাস্তব প্রয়োগ খুব বেশি না পান, তাহলে বাড়তি প্রসেসিং ক্ষমতার বিনিময়ে বেশি দাম দেওয়ার আগ্রহ কমতে পারে। সেখানেই অ্যাপলের নতুন কৌশলের আসল পরীক্ষা।
বর্তমানে অ্যাপলের শেয়ার ‘AAPL’ প্রতীকে ন্যাসডাকে লেনদেন হচ্ছে। ২৬ আগস্টের বাজার বন্ধের সময় শেয়ারটির দাম ছিল প্রায় ৩১৩.৪৫ ডলার এবং কোম্পানিটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪.৫৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
সবমিলিয়ে, অ্যাপলের নতুন ম্যাক লঞ্চকে শুধু নতুন প্রসেসর বা কম্পিউটার আপগ্রেড হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। কোম্পানিটি মূলত একটি বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—আগামী দিনের এআই কি শুধু ডেটা সেন্টারে থাকবে, নাকি এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলে আসবে ডেস্কে থাকা ব্যক্তিগত কম্পিউটারেও?
অ্যাপলের নতুন M6 ও M5 Ultra সেই পরিবর্তনের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন