বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব
১. প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ:
রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভূমিকা রাখতে হবে।
২. সহিংসতা বন্ধ ও অধিকার নিশ্চিত:
রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নিরাপদে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা পান।
৩. মানবিক সহায়তা বাড়ানো:
রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিনের এই সংকটে স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
৪. ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত:
রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
৫. আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন:
মাদকপাচার, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন শুধু সহমর্মিতা প্রকাশ নয়, সংকটের মূল কারণ ও সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়। প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এই বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটাতে হবে।
‘মানবিকতার তাগিদেই সীমান্ত খুলেছিল বাংলাদেশ’
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৭ সালের সহিংসতার পর সংকট আরও তীব্র হয়। এর পর থেকে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।
শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমও চালু রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য শিবিরগুলো কোনো আদর্শ স্থান নয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে মানবপাচার, মাদকপাচার ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
‘মানবিক সহায়তা কমে আসছে’
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে।
তার ভাষ্য, মানবিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর মাধ্যমে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি আড়াল করা যাবে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই সংকটের ভার শুধু বাংলাদেশের ওপরও থাকা উচিত নয়।
‘সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুধু একটি মানবিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, অধিকার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও জড়িত।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর প্রত্যাশা, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস না হয়ে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্পে পরিণত হয়।
সূত্র: বাসস
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন