খুলনায় ‘হানি ট্র্যাপ’ নতুন এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। প্রেম, রোমান্টিক বা যৌন সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ফাঁদে ফেলে পরে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা নগর ও আশপাশের এলাকায় ১৫ থেকে ২০টি সক্রিয় চক্র এ ধরনের অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব চক্রের প্রধান টার্গেট উঠতি বয়সী, বিত্তশালী ও সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা।
চক্রগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ, প্রেমের সম্পর্ক তৈরি কিংবা নারী সঙ্গের প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের নির্দিষ্ট স্থানে ডেকে নেয়। সেখানে গোপনে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ধারণের পর তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ফেসবুক, ইমো, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে এসব ফাঁদ পাতা হচ্ছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে প্রতারকরা ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাকমেইল করছে।
অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক সম্মান ও পারিবারিক জটিলতার ভয়ে বিষয়টি পরিবার কিংবা পুলিশকে জানান না। ফলে এ ধরনের অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা
গত ১০ সেপ্টেম্বর খুলনার সাতরাস্তা মোড়ের স্বপ্ন মহল আবাসিক হোটেলে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক যুবককে আটকে রেখে মারধর, বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ ওঠে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ইমরান হোসেন নামের ওই যুবককে অনলাইনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে হোটেলের ৩০৬ নম্বর কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে আটকে মারধর ও বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ। পরে তার কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
মুক্তিপণ দিতে রাজি না হওয়ায় তার মুঠোফোন ব্যবহার করে পরিচিতদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২৬ হাজার টাকা আদায় করা হয়। তাঁর কাছে থাকা নগদ ১ হাজার ৩০০ টাকা ও মুঠোফোনও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
পরে খবর পেয়ে পুলিশ হোটেলে অভিযান চালিয়ে চার নারী ও চার পুরুষকে আটক করে।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর মামলার কাগজপত্র দেখানোর কথা বলে আইনজীবী খায়রুল ইসলাম নয়নকে বটিয়াঘাটা উপজেলার চক্রাখালী এলাকায় ডেকে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে মরিয়ম আক্তার নামের এক নারীর বিরুদ্ধে। পরে তাকে একটি বাসায় আটকে রেখে মারধর এবং ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীর স্ত্রীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে নয়নকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় মরিয়ম আক্তার, রীনা পারভীন ও মো. জুবায়ের হোসেন রিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ভুক্তভোগীর স্বাক্ষর করা দুটি ফাঁকা স্ট্যাম্প, প্লাস্টিকের পাইপ ও একটি সংবাদপত্রের পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ছাড়া মরিয়মের বাসা থেকে একাধিক ব্যক্তির পরিচয়পত্র, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
ফুলতলায় একই ধরনের অভিযোগ
গত ২৯ জুলাই খুলনার ফুলতলায় এক যুবককে হানি ট্র্যাপে ফেলে নির্জন কক্ষে আটকে রেখে মারধর, নগ্ন ভিডিও ধারণ ও ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, যশোরের একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মী মিলন হোসেনকে ঝুমুর জমাদ্দার নামের এক নারী একটি বাসায় নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা কয়েকজন তাঁর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন বলে অভিযোগ।
পরে অভিযুক্তরা কক্ষে প্রবেশ করে মিলন হোসেনকে মারধর এবং তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। তাঁর চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে কয়েকজনকে আটক করে পুলিশে খবর দেন।
এ ঘটনায় মিলন হোসেন বাদী হয়ে ফুলতলা থানায় মামলা করেন।
এর আগে ৮ জুলাই খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে একটি চক্রের সাত নারী সদস্যকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, চক্রটি বিত্তশালী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের টার্গেট করে একটি ফ্ল্যাটে ডেকে আনত। পরে জিম্মি করে আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ধারণের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হতো।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনায় ১৫ থেকে ২০টি হানি ট্র্যাপ চক্র দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে অপরাধ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব চক্র প্রতিষ্ঠিত ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করে সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে ছবি, অডিও ও ভিডিও ধারণের পর ব্ল্যাকমেইল করছে।
তিনি বলেন, কয়েকটি চক্রের সদস্য পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও বড় চক্রের মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-খুলনার সভাপতি রমা রহমান বলেন, হানি ট্র্যাপসহ যেকোনো ধরনের প্রতারণা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধীদের যথাযথভাবে আইনের আওতায় এনে আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
পুলিশের সতর্কবার্তা
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এম এম শাকিলুজ্জান বলেন, হানি ট্র্যাপ এক ধরনের অপকৌশল, যেখানে অসচেতন ব্যক্তিদের অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হয়।
তিনি অপরিচিত ব্যক্তির ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি হানি ট্র্যাপে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
যেভাবে সতর্ক থাকবেন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সামিউল হকের পরামর্শ, অনলাইনে বা অফলাইনে নতুন কারও সঙ্গে পরিচয়ের পর দ্রুত ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়ানো উচিত নয়। পরিচয় ও তথ্য যাচাই ছাড়া অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে একান্তে দেখা করা বা অজ্ঞাত স্থানে যাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, পরিচয়পত্র বা আর্থিক তথ্য অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পাশাপাশি সন্দেহজনক যোগাযোগ বা হুমকির শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন