লোকোমোটিভ সংকটে দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালবাহী পরিবহন ব্যবস্থা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন চালাতে না পারায় ব্যবসায়ীরা বেশি খরচের সড়ক ও নৌপথের দিকে ঝুঁকছেন। এর প্রভাব পড়ছে রেলের আয়, বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন এবং সরকারি রাজস্ব আদায়েও।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে কনটেইনার পরিবহন থেকে রেলের আয় কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে পরিবহন করা পণ্যের পরিমাণ এবং ব্যবহৃত ওয়াগনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেলের ওয়াগনে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করা হয়। এ সময় ৮০ হাজার ৭১৯টি ওয়াগন ব্যবহার করে আয় হয় ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৭ হাজার ২৩ মেট্রিক টনে। ৬৩ হাজার ১০০টি ওয়াগন ব্যবহার করে আয় হয় ৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। ওই বছর ৫৪ হাজার ৫৬৯টি ওয়াগনে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করা হয়। এ খাত থেকে রেলের আয় হয় ৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে তিন বছরে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ লোকোমোটিভ সংকট। হাতে থাকা ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী মালবাহী ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, লোকোমোটিভ সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আগের মতো নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রাখার সুযোগ না থাকায় আগে সেগুলোর জন্য লোকোমোটিভ বরাদ্দ দিতে হয়। এরপর অবশিষ্ট ইঞ্জিন দিয়ে কনটেইনার ট্রেন চালানো হয়।
রেলওয়ের হিসাবে, কনটেইনার ট্রেন পরিচালনায় প্রতিদিন তিন থেকে চারটি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী সেটিও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে মালবাহী ট্রেন পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রয়োজন। অথচ প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় অনেক কম ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছে।
এ সংকটের প্রভাব পড়েছে কমলাপুর আইসিডির কার্যক্রমেও। আইসিডির তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সর্বশেষ জুলাইয়ে বিল অব এন্ট্রি দাখিল কমেছে ৩৩ দশমিক ০৯ শতাংশ। কনটেইনার চলাচল কমেছে ৪৭ দশমিক ০৯ শতাংশ, আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ ৫৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মূল্যায়নযোগ্য মূল্য ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে।
আগের অর্থবছরের জুলাইয়ে বিল অব এন্ট্রির সংখ্যা ছিল ৮২২টি, যা সর্বশেষ জুলাইয়ে কমে হয়েছে ৫৫০টি। একই সময়ে কনটেইনার চলাচল ১ হাজার ৫৭৯টি থেকে কমে ৮৩৬টিতে নেমেছে। আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ ২৬ হাজার ৪১০ টন থেকে কমে হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৪২ টন। মূল্যায়নযোগ্য পণ্যের মূল্য ৬৪০ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৩৯ কোটি টাকা হয়েছে। আর রাজস্ব আদায় ২৯৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
কমলাপুর রেলওয়ে আইসিডির কমিশনার (কাস্টমস) কাজী মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন কনটেইনার পরিবহন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে লোকোমোটিভ সংকটকে দায়ী করেছেন। তার মতে, নিয়মিত মালবাহী ট্রেন না আসায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে সড়ক ও নৌপথে পণ্য পরিবহন করছেন। কনটেইনার চলাচল কমে যাওয়ায় এর প্রভাব রাজস্ব আদায়েও পড়ছে।
কনটেইনার ট্রেনের অপর্যাপ্ত সরবরাহ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও একাধিকবার রেলওয়েকে চিঠি দিয়েছে। গত ১০ আগস্ট পাঠানো এক চিঠিতে কমলাপুর আইসিডিতে পর্যাপ্ত কনটেইনার ট্রেন সরবরাহের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, আগের এক সভায় প্রতি মাসে কমলাপুর আইসিডিতে প্রায় ৯০টি কনটেইনার ট্রেন সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মে মাসে ৩২টি, জুনে ৪৪টি এবং জুলাইয়ে মাত্র ৩৬টি কনটেইনার ট্রেন সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২২টি ট্রেন পেয়েছে আইসিডি। এতে আমদানি করা পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে।
একই সঙ্গে খালি কনটেইনার এবং রপ্তানিপণ্যবোঝাই কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে ফেরত নেওয়ার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আইসিডিতে কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকছে এবং আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও শিপিং এজেন্টদের ব্যয় বাড়ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কিছু শিপিং লাইন কমলাপুর আইসিডির পরিবর্তে বিকল্প টার্মিনাল বা বন্দর ব্যবহারের কথা বিবেচনা করতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার (আইসিডি, কমলাপুর) মোহাম্মদ আশরাফ করিম চৌধুরী বলেন, সংকট সমাধানে রেলওয়েকে একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছে। আইসিডির স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য মাসে ৯০টি কনটেইনার ট্রেন প্রয়োজন হলেও ৩০টির বেশি ট্রেনও অনেক সময় পাওয়া যাচ্ছে না।
এর আগে বিভিন্ন সময়েও লোকোমোটিভ সংকটে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। ২০২৫ সালে রেলওয়ের মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে ঢাকামুখী কনটেইনারের জট তৈরি হয়েছিল।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত মিটারগেজ লোকোমোটিভের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন পাওয়া গেলে যাত্রী ও মালবাহী—দুই ধরনের ট্রেন থেকেই আয় বাড়ানো সম্ভব হবে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, মালবাহী পরিবহন রেলওয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সেবা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোর মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনে রেলের সুবিধা রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত ট্রেন না চলায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
কনটেইনার ট্রেনের অনিয়মিত চলাচলের কারণে ব্যবসায়ীদের একদিকে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বন্দরে ও আইসিডিতে পণ্য জমে থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত খরচও বাড়তে পারে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, লোকোমোটিভ সংকট কাটাতে পুরোনো ইঞ্জিন মেরামতের পাশাপাশি নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত ইঞ্জিন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি নির্ধারিত মালবাহী ট্রেন নিয়মিত চালানো কঠিন হবে।
ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে রেলপথের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে লোকোমোটিভ সংকট এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য কনটেইনার ট্রেন সেবা নিশ্চিত করা না গেলে ব্যবসায়ীরা বিকল্প পরিবহনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন