শত বছরের স্থায়িত্বের প্রত্যাশা নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ভবনগুলো। অথচ নির্মাণের মাত্র ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও ছাদ ও দেয়ালে ফাটল, কোথাও ভেঙে গেছে বিম। আবার কোনো কোনো ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছে শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর।
এমন পরিস্থিতিতে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। এরই মধ্যে কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাঈদা রুবায়াত বিষয়টি স্বীকার করে জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। যেসব কক্ষ ক্লাস নেওয়ার উপযোগী নয়, সেসব কক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে বিকল্প কক্ষে পাঠদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে অনিয়ম, প্রকৌশল বিভাগের গাফিলতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতার কারণে ভবনগুলো দ্রুত জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
গোবরা গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, ভবন নির্মাণের সময় যথাযথভাবে সিমেন্ট ব্যবহার করা হলে এবং নির্মাণের পর নিয়ম অনুযায়ী পানি দেওয়া হলে এত দ্রুত ভবনগুলোর পলেস্তারা খসে পড়ত না।
পাছেরকান্দার বাসিন্দা আব্দুল হালিমের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের সময় প্রকৌশল বিভাগের গাফিলতির কারণেই কয়েক বছরের মধ্যে ভবনগুলোতে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
তবে উপজেলা প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এতগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ—এ বিষয়ে তার বিস্তারিত জানা নেই। তার দাবি, ওই সময়ের অধিকাংশ ভবন ছিল ব্রিকসের তৈরি, যে কারণে সেগুলো দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
বিদ্যালয়গুলোর করুণ চিত্র
গৌরীপুর পৌর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম মাজহারুল আনোয়ার ফেরদৌস জানান, পুরো ভবনটিই ঝুঁকিপূর্ণ। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, বিভিন্ন স্থানে জোড়াতালি দিয়ে ভবন টিকিয়ে রাখা হয়েছে। দেয়ালে টোকা দিলেই পলেস্তারা ঝরে পড়ে। প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান করতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
জাগরণী পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সানজিদা ইয়াসমিন জানান, বিদ্যালয়ের একটি ভবন ১৯৮২ সালে নির্মিত। সেটি এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০১১ সালে নির্মিত চার কক্ষের ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে, বিম ফেটে গেছে এবং দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে।
মাছুয়াকান্দা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে সমস্যা হচ্ছে।
গোলকপুর পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্যাসিফ্লোরা সুলতানা জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে ২০০৩ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ হয় এবং ২০১০ সালে দোতলার কাজ সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং বিমে ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝুঁকি নিয়েই শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হচ্ছে।
নূতন বাজার পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহসিনা ফিরদাউস জানান, ভবনের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিলেই পলেস্তারা খসে পড়ে। একটি বিম পুরোপুরি ফেটে গেছে। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে বারান্দায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে হচ্ছে এবং কখনো একই কক্ষে দুটি শ্রেণির পাঠদান চলছে।
পাছেরকান্দা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, ২০০৭ সালে নির্মিত ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। অফিস ও শ্রেণিকক্ষের পলেস্তারা খসে পড়ছে।
আহছানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছাম্মাৎ জিন্নাত রেহানা জানান, ২০১০ সালে হস্তান্তর করা ভবনের ছাদ ও শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বারান্দাসহ প্রায় পুরো ভবনেই ভাঙন দেখা দিয়েছে।
পানাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবু সাইদ বলেন, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে নির্মিত ভবনটির দোতলার ফাউন্ডেশন থাকলেও ত্রুটির কারণে পরে আর দোতলা করা হয়নি। এখন একতলা ভবনটিও বিভিন্ন স্থানে ভেঙে যাচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
ভাংনামারী ইউনিয়নের ভোলারআলগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক জানান, ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। নিয়মিত পলেস্তারা খসে পড়ছে।
লক্ষীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ফকির জানান, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নির্মিত ভবনটি দোতলা করার জন্য ফাউন্ডেশন করা হলেও শেষ পর্যন্ত একতলাই নির্মিত হয়। এখন কয়েক বছরের মধ্যেই ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
গোবরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের টিনশেড ভবনে ক্লাস নিতে হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক আব্দুল কদ্দুস জানান, শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিমের পলেস্তারা খসে শিক্ষার্থীদের মাথায় পড়ছে। ঝুঁকির কারণে একটি শ্রেণির পাঠদান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকিতে ৩৫ বিদ্যালয়
উপজেলা শিক্ষা বিভাগের তালিকায় ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—গৌরীপুর পৌর মডেল, মাছুয়াকান্দা, গোলকপুর, জাগরণী, নূতন বাজার, পাছেরকান্দা, আহসানপুর, পানাটি, ভোলারআলগী, কলতাপাড়া, লক্ষীপুর, গুজিখাঁ, বেতান্দর আদর্শ সংসদ, পশ্চিমপাড়া, সহনাটী, ভালুকাপুর, টেংগাপাড়া, লাটুরপায়ার, শাহাবাজপুর, বহেড়াতলা, নিজমাওহা, চড়াকোনা, সিংরাউন্দ, শাহগঞ্জ, ধারাকান্দি, কিল্লাতাজপুর, চল্লিশা কড়েহা, কাশিয়ারচর, লংক্ষাখোলা, মরিচালী, গোবরা, মহিশ্বরণ, বারুয়ামারী, বেরাটি আজমত আলী ও শেখ খমির উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলতে থাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, পুনর্নির্মাণ বা বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন