আগে যে সমস্যাটি PCOS (Polycystic Ovary Syndrome—পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম) নামে পরিচিত ছিল, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নতুন ঐকমত্যের ভিত্তিতে এর নাম পরিবর্তন করে PMOS (Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome) করা হয়েছে। নতুন নামটি এই সমস্যার হরমোন, বিপাকীয় ও ডিম্বাশয়-সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যগুলোকে আরও ভালোভাবে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।
PMOS নারীদের একটি দীর্ঘমেয়াদি হরমোনজনিত ও বিপাকীয় সমস্যা। অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত ওজন, ব্রণ, মুখ বা শরীরে অস্বাভাবিক ও অবাঞ্ছিত লোম, ঘাড় বা বগলে কালচে দাগ এবং সন্তান ধারণে সমস্যাসহ বিভিন্ন উপসর্গের সঙ্গে PMOS-এর সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সব নারীর ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না।
কেন নাম পরিবর্তন করা হলো?
PCOS নামটির কারণে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হতে পারে যে এটি মূলত ডিম্বাশয়ে সিস্ট হওয়ার সমস্যা। কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, বিপাকীয় পরিবর্তন এবং ডিম্বাশয়ের কার্যক্রমের মতো একাধিক বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তাই রোগটির বৈশিষ্ট্যকে আরও যথাযথভাবে তুলে ধরতে Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome বা PMOS নামটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
খাদ্যাভ্যাসে কী পরিবর্তন আনবেন?
PMOS-এর সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সম্পর্ক অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তাই খাবারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে পুষ্টিকর ও আঁশযুক্ত খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন—
বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
ডাল, ছোলা ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার
মাছ, ডিম ও পরিমিত চর্বিহীন মাংস
সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার
বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার পরিমিত পরিমাণে
পরিমিত পরিমাণে মৌসুমি ফল
পর্যাপ্ত পানি
অন্যদিকে কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, প্যাকেটজাত জুস, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো উচিত।
ওজন নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব
যাদের ওজন বেশি, তাদের ক্ষেত্রে শরীরের ওজনের একটি পরিমিত অংশ কমানো অনেক সময় মাসিকের নিয়মিততা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করতে পারে। তবে স্বাভাবিক ওজনের নারীদেরও PMOS হতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ওজন কমানো নয়; বরং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখা।
নিয়মিত ব্যায়াম কতটা জরুরি?
PMOS ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম। দ্রুত হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার, দৌড় বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যান্য ব্যায়াম করা যেতে পারে। পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েক দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামও উপকারী।
একসঙ্গে অতিরিক্ত ব্যায়াম করার চেয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি
PMOS ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও অবহেলা করা উচিত নয়। অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিদিন নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা এবং একটি স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখা জরুরি।
শুধু খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামই কি যথেষ্ট?
সবসময় নয়। PMOS-এর চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর বয়স, উপসর্গ, ওজন, মাসিকের ধরন, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ওপর। জীবনযাপনের পরিবর্তন অনেকের চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও, কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘদিন মাসিক অনিয়মিত থাকা, অতিরিক্ত রক্তপাত, সন্তান ধারণে সমস্যা, দ্রুত ওজন বৃদ্ধি অথবা অতিরিক্ত অবাঞ্ছিত লোম ও ব্রণের মতো উপসর্গ থাকলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে গাইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শেষ কথা
PCOS থেকে PMOS—নাম পরিবর্তন হলেও সচেতনতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব কমেনি। PMOS একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা হলেও সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে এর উপসর্গ ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তাই PMOS নিয়ন্ত্রণের মূল কথা হলো—শুধু ওষুধ নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
ডা. তাহমিনা আক্তার মুনা
গাইনি, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন
এমবিবিএস (রামেক), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
ডিজিও (গাইনি ও অবস্)
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এসিএস-এএফ (আমেরিকা), সিএমইউ (আল্ট্রা)
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সেনবাগ, নোয়াখালী
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন